তেহরান কখনোই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না: জ্যেষ্ঠ ইরানি আইনপ্রণেতা
ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকবে ছাড়বে—এমন প্রশ্নের জবাবে দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা বলেছেন, 'কখনোই না।'
তেহরানে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমান সংসদ সদস্য ইব্রাহিম আজিজি বলেন, 'এটি আমাদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকার এবং অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি ইরানই নির্ধারণ করবে।'
তিনি আরও জানান, বিষয়টি এখন দেশটির আইনে পরিণত হতে যাচ্ছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির প্রধান আজিজি বলেন, 'আমরা সংবিধানের ১১০ নম্বর অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করে পার্লামেন্টে একটি বিল আনছি। এতে পরিবেশ রক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আর আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এই আইন বাস্তবায়ন করবে।'
কৌশলগত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সংকট এক দিনে মিটে যাওয়ার মতো কোনো সাময়িক বিষয় নয়।
ইব্রাহিম আজিজি এই অত্যন্ত কৌশলগত প্রণালিকে শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের এক বড় 'সম্পদ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের কট্টরপন্থী নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্টে আজিজি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। ইসরায়েলি হামলায় একের পর এক শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পর ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে অতিরিক্ত সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণে। আজিজির বক্তব্যে মূলত এই নতুন ধারার নীতিনির্ধারকদের চিন্তাধারাই ফুটে উঠেছে।
তেহরান এখন মনে করছে, জ্বালানি তেলের ট্যাংকারসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কেবল বর্তমান আলোচনার কোনো দরকষাকষির বিষয় নয়, বরং এটি তাদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি বলেন, 'যুদ্ধের পর ইরানের প্রথম অগ্রাধিকার হবে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ডিটারেন্স ফিরিয়ে আনা। আর হরমুজ প্রণালি তেহরানের প্রধান কৌশলগত শক্তিগুলোর একটি।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'ইরানের তৈরি করা নতুন কাঠামোর আওতায় অন্য দেশগুলো কীভাবে এই জলপথ থেকে উপকৃত হতে পারবে, তা নিয়ে তেহরান আলোচনায় রাজি। তবে এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।'
ইরানের এই পরিকল্পনা তাদের অনেক প্রতিবেশী দেশই মেনে নিতে নারাজ। গত পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধে তাদের ওপর ইরানের হামলার ঘটনায় তারা আগে থেকেই ক্ষুব্ধ। বর্তমানে এক ভঙ্গুর ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও সেই উত্তেজনা এখনো বিরাজমান।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ড. আনোয়ার গারগাশ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এই পদক্ষেপকে 'শত্রুতামূলক জলদস্যুতা' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি এই আন্তর্জাতিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকার করে, তবে তা বিশ্বের অন্যান্য কৌশলগত জলপথের জন্য এক 'বিপজ্জনক নজির' হয়ে থাকবে।
এর জবাবে ইরানি রাজনীতিবিদ আজিজি পাল্টা আক্রমণ করে বলেন, 'তারাই আসল জলদস্যু যারা আমাদের অঞ্চলকে আমেরিকানদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।' মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য অবকাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এই মন্তব্য করেন, যেখানে ইরান বারবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র হলো 'বিশ্বের সবথেকে বড় জলদস্যু।'
আজিজি জোর দিয়ে বলেন, 'আমরা সবসময় বলে এসেছি, আমাদের অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের একসাথে কাজ করা প্রয়োজন।'
তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই ভাবনাটি বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশের জন্য এখন অতীত। ব্যতিক্রম কেবল ওমান, যারা এই অঞ্চলে ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং এই প্রণালির দক্ষিণ উপকূল নিয়ন্ত্রণ করে। জাহাজগুলোর নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে চলতি মাসের শুরুর দিকে তেহরানের সঙ্গে ওমানের আলোচনাও হয়েছে।
ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে মতভেদের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যদিও সেই বিরোধ ঠিক কতটা জোরালো তা এখনও অস্পষ্ট।
সম্প্রতি এই মতভেদ প্রকাশ্যে আসে যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি 'পুরোপুরি খোলা' রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে এর জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় বড় অক্ষরে 'ধন্যবাদ' লিখে প্রতিক্রিয়া জানান।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো আরাগচির কড়া সমালোচনা শুরু করে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই পোস্ট ট্রাম্পকে বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে নিজেকে যুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করার এবং জয়ের উৎসব করার মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছে।
আরেক সংবাদ সংস্থা তাসনিম এটিকে একটি 'ভুল ও অসম্পূর্ণ টুইট' হিসেবে বর্ণনা করে, যা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর অস্পষ্টতা তৈরি করেছে।
আরাগচি পরে জোর দিয়ে বলেন, এই জলপথটি কেবল আইআরজিসি নৌবাহিনী কর্তৃক অনুমোদিত জাহাজের জন্য এবং নির্ধারিত রুটে 'ফি' প্রদানের মাধ্যমেই উন্মুক্ত থাকবে।
তবে আজিজি এই মতভেদের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, 'যখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে, তখন আমাদের মধ্যে উদারপন্থী বা কট্টরপন্থী বলে কোনো আলাদা অবস্থান থাকে না।'
তিনি জানান, এই কৌশলগত জলপথের ভাগ্য নির্ধারিত হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সরাসরি আলোচনার প্রথম দফার পর মঙ্গলবার থেকে সেখানে পুনরায় উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রণালির বিষয়টিই হবে আলোচনার অন্যতম মূল ইস্যু।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি একটি প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছেন। এর নেতৃত্বে আবারও থাকবেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
ইরানি প্রতিনিধি দল, যার নেতৃত্বে থাকার কথা পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফের, তারা পাকিস্তানে ফিরবেন কিনা সে বিষয়ে কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত নীরব রয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকা পর্যন্ত ইরান এই আলোচনায় অংশ নেবে না।
ট্রাম্প বারবার ইরানকে এই সামুদ্রিক করিডোর খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি গত ৫ এপ্রিল এক আক্রমণাত্মক পোস্টে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, তার নির্দেশ পালন না করলে ইরানকে 'নরক যন্ত্রণার' মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তিনি এখন তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে 'ব্ল্যাকমেইল' করার অভিযোগ তুলছেন।
এই অভিযোগের উত্তরে আজিজি ব্যঙ্গ করে বলেন, 'যে লোক সত্যকে বিকৃত করে তার কাছ থেকে আমি বেশি কিছু আশা করি না। আমরা কেবল আমেরিকার ব্ল্যাকমেইলের মুখে আমাদের অধিকার রক্ষা করছি।'
ইরানের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তার মতো আজিজিও প্রায়ই ট্রাম্পকে উপহাস করে এক্স-এ পোস্ট দেন। ইরানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা প্রায় পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্ন থাকলেও আজিজিরা নিয়মিত আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন।
আজিজির কাজের পরিধিতে জাতীয় নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত। তিনি ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা কবে তোলা হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি। তিনি কেবল গুরুত্ব দিয়ে বলেন, 'যখন দেশ নিরাপদ ও সুরক্ষিত হবে তখন আমরা এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেব যাতে শত্রুরা সুযোগ নিতে না পারে।'
জানুয়ারি মাসে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ এবং এতে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ও বর্তমানে আটক বিক্ষোভকারীদের অনেকের মৃত্যুদণ্ড হওয়ার বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গেও আজিজি কথা বলেন। তিনি সরকারের সেই পুরনো দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, এই অস্থিরতার পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরায়েলি সংস্থা মোসাদ জড়িত ছিল।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আরও কঠোর হবে বলে ইরানিদের মধ্যে যে উদ্বেগ বাড়ছে, তা-ও তিনি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, 'যুদ্ধে, এমনকি যুদ্ধবিরতির সময়েও কিছু নিয়ম থাকে।'
