চীনের সতর্ক কূটনীতি: ইরান যুদ্ধ ঘিরে নেপথ্যে যে ভূমিকা রাখছে বেইজিং
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগের সপ্তাহগুলোতে বেইজিং তুলনামূলকভাবে খুব বিবৃতি দিয়েছে, যদিও ইরান দীর্ঘদিন ধরে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এমনকী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরেও শোকপ্রকাশের বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতা দেখা যায়নি বেইজিং থেকে। তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচনের ঘটনায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানায়, তারা এঘটনার সঙ্গে "প্রাসঙ্গিক প্রতিবেদন তারা লক্ষ করেছে"।
এভাবেই সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে করতে বেইজিং নিজেকে একধরনের শান্তিরক্ষক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস করেছে। তবে একই সঙ্গে এমন একটি অঞ্চলের যুদ্ধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, যেখানে তাদের সামরিক প্রভাব সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো উত্তেজনা এড়িয়ে চলা এবং একই সঙ্গে দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাই—চীনের এই সতর্ক অবস্থানে প্রতিফলিত হয়েছে।
বেইজিংয়ের কাছে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা এখন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরনেতৃত্বে পরিচালিত এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে এবং তেলের দাম বাড়িয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে এই যুদ্ধে অতিরিক্ত জড়ানোর কোনো প্রণোদনা চীনের নেই।
তবে এ সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের তীব্র সমালোচনা করতে চীন দ্বিধা করেনি। তারা একে "বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ" বলে আখ্যা দেয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বলেন, "এটি কেবল মুখোমুখি অবস্থানকে তীব্র করবে, উত্তেজনা বাড়াবে, ইতোমধ্যে নাজুক যুদ্ধবিরতিকে দুর্বল করবে এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপদ নৌ চলাচলকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।" তিনি আরও বলেন, "চীন বিশ্বাস করে, কেবল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিই পরিস্থিতি প্রশমনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।"
ভূরাজনৈতিকভাবে ইরানকে চুক্তিতে বাধ্য করার মতো সক্ষমতা চীনের থাকলেও—দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ ধরনের পদক্ষেপে আগ্রহ দেখাননি, কারণ এতে চীনের তেমন কোনো লাভ নেই।
চীনের পররাষ্ট্রনীতির একটি মূলনীতি হলো 'হস্তক্ষেপ না করা'। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের চীন, তাইওয়ান ও মঙ্গোলিয়া বিষয়ক সাবেক পরিচালক রায়ান হাস বলেন, বেইজিং ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে অতিরিক্ত দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় না এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় নতুন কোনো দায়িত্ব নেওয়ার প্রত্যাশাও তৈরি করতে চায় না।
তিনি বলেন, "চীনের জন্য এই অঞ্চলে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা কোনো অর্জন নয়, বরং এড়ানোর উচিৎ এমন একটি ফাঁদ। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা চীনের নেতাদের জন্যও সতর্কবার্তা।"
মধ্যপ্রাচ্যে চীনকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক বৈঠক করছে বেইজিং। আবুধাবির যুবরাজ খালেদ বিন মোহাম্মদ আল-নাহিয়ানের চীন সফরও এর অংশ, যেখানে নিজেদের "দায়িত্বশীল রাষ্ট্র" হিসেবে "গঠনমূলক ভূমিকা" পালনের কথা বলেছে চীন।
এ সপ্তাহে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ-এর সঙ্গে বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, চীন চায় "বিশ্ব যেন আবার জঙ্গলের আইনে ফিরে না যায়"—যা বিশ্লেষকদের মতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি পরোক্ষ সমালোচনা। কারণ ট্রাম্প প্রকাশ্যেই এর আগে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনকানুনের তোয়াক্কা তিনি করেন না।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বেইজিংয়ের জন্য ঝুঁকি রয়েছে। জ্বালানি তেলের বিপুল কৌশলগত মজুত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আধিপত্য থাকায়চীন কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও—মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে প্রভাব ফেলবে, তা থেকে চীনও মুক্ত নয়। তাছাড়া, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটজনিত মূল্যস্ফীতি ও রপ্তানি চাহিদা হ্রাস—চীনের অর্থনীতির জন্যও মারাত্মক হতে পারে।
ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায়ও চীনের বড় স্বার্থ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ওয়াং ইওয়েই।
তিনি বলেন, "এই অঞ্চলে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে, যার মধ্যে কৌশলগত অবকাঠামো ও সংযোগ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত—যেগুলো সংঘাতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীন চায় সংঘাত থামুক এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক, যাতে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে।
ঘটনাপ্রবাহের সময়ের দিক থেকেও পরিস্থিতি চীনের জন্য বেশ জটিল। প্রায় এক দশক পর আগামী মাসে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে বেইজিং।
বাণিজ্য উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করা চীনের অগ্রাধিকার হওয়ায়, ইরানের পক্ষে কোনো পদক্ষেপ নিতে তারা সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, "হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে খুলে দেওয়ায় চীন খুবই খুশি। আমি তাদের জন্যও এটি করছি—বিশ্বের জন্যও… কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রেসিডেন্ট শি আমাকে জড়িয়ে ধরবেন। আমরা একযোগে বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করছি।"
তবে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের সমালোচনা যেমন করেছে, তেমনি এই সংঘাতে চীনের গভীর সম্পৃক্ততার বিপক্ষেও সতর্ক করেছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা- শিনহুয়া গ্রিক পুরাণের সিসিফাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার তুলনা করেছে।
৩১ মার্চের এক মন্তব্যে তারা বলে, "বিশ্বের একমাত্র সুপারপাওয়ার হয়েও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ধ্বংস করতে পারে বা মানুষ হত্যা করতে পারে, কিন্তু বহুমেরু বিশ্বের এই যুগে কখনোই পুরো বিশ্বকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে না—যেমন সিসিফাস কখনোই পাথরের চাইটিকে পাহাড়ের চূঁড়ায় তুলতে পারে না।"
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ মাসে বাহরাইনের প্রস্তাবিত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার প্রস্তাবে রাশিয়ার সঙ্গে চীন ভেটো দেয়। চীনের মতে, ঐ প্রস্তাবটিতে চলমান সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভূমিকা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কারণ, আলোচ্য দেশদুটির আক্রমণের প্রেক্ষাপটেই হরমুজ প্রণালি অবরোধ করেছে ইরান।
ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে চীন দেশটির প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও—বেইজিংয়ের মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতির মূল ফোকাস ইরান বা ইসরায়েল নয়। বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ শি গ্যাংঝেং বলেন, চীন এ দুই দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল) "সংঘাতনির্ভর" শক্তি হিসেবে দেখে।
বরং দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে চীন, কারণ তারা স্থিতিশীল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চীনের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।
লানঝৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঝু ইয়ংবিয়াও বলেন, চীন নিজেকে "প্রধান মধ্যস্থতাকারী" হিসেবে দেখে না, তবে সংঘাত উসকে না দিয়ে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে চায়।
উদাহরণ হিসেবে, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার প্রথম দফা ব্যর্থ হওয়ার পর—চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
চীন এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ব্যবহার করে, সরাসরি জড়িত না হয়েও মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
তবে প্রকাশ্যে চীনের ভূমিকা সীমিত। তারা পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল পুনঃস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিককরণে যে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল চীন, এবার তার চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এখন পর্যন্ত চীন প্রকাশ্যে কোনো ভূমিকা স্বীকার করেনি, যদিও গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে যে ইরানকে আলোচনায় আনতে তারা সহায়তা করেছে।
শি গ্যাংঝেং বলেন, "এক অর্থে বলা যায়, চীন এই বিষয়টি সামাল দিতে পাকিস্তানকে 'সাদা দস্তানা' হিসেবে ব্যবহার করছে।"
তবে নেপথ্যে চীন ইরানকে সামরিক সহায়তাও দিতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই চীনের একটি গোয়েন্দা স্যাটেলাইট কেনে ইরান, যেটি মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারি চালাতে পারে। ওই স্যাটেলাইটের সাহায্যেই যুদ্ধ চলাকালে এসব ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়। যদিও বেইজিং এসব দাবি অস্বীকার করেছে। এছাড়া, চীন ইরানকে কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী মিসাইল সরবরাহ করছে এমন খবরও সামনে এসেছে।
তবে এই সংঘাতের মধ্যে কূটনীতি সামলাতে গিয়ে চীন খেয়াল রাখছে আসন্ন ট্রাম্প-শি বৈঠক নিয়ে।
ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও আমেরিকান স্টাডিজের উপ-পরিচালক ঝাও মিনঘাও বলেন, "ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিরক্ত না করা—এই দুইয়ের মধ্যে চীন এক ধরনের দ্বিধায় রয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, চীন চায় ইরান ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক থেকে আলাদা রাখতে, যাতে সামগ্রিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা যায়।
চলতি বছরে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে অন্তত চারবার বৈঠকের আশা করছে যুক্তরাস্ত্র-চীন। কিন্তু, ইরান যুদ্ধ যদি দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে রূপ নেয়, তাহলে সেই সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। "ট্রাম্প যদি বৈঠক বাতিল করেন, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের জন্য একটি খারাপ সূচনা হবে," তিনি সতর্ক করেন।
