হরমুজ প্রণালি খুললেও কেন সংকট কাটবে না: তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা অব্যাহত
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এখনো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হলেও এবং তেলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যবাহী জাহাজ বের হতে পারলেও—পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে না।
এর মূল কারণ হলো, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে খালি জাহাজগুলোকে আবার প্রণালিতে ফিরে আসতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি সাময়িক হওয়ার ঝুঁকি থাকলে—শিপিং কোম্পানিগুলো এই পথে আবারো তাদের জাহাজ নিয়ে প্রবেশ করতে চাইবে না।
ট্যাংকার ও জাহাজ মালিকরা—এমনকি তাদের বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোও—তাদের জাহাজকে উপসাগরে পুনরায় পাঠাতে রাজি হবে না, যদি না তারা নিশ্চিত হয় যে জাহাজগুলো সেখানে কয়েক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় আটকে পড়বে না, বলেন ই-টোরোর বিশ্ববাজার বিশ্লেষক লালে আকোনার।
তিনি বলেন, "দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, তাও যদি ভঙ্গুর হয়—তা জাহাজ পরিচালনাকারীদের প্রয়োজনীয় আস্থা দিতে পারবে বলে আমি মনে করি না।"
নতুন জাহাজ পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে তেল, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের দায়িত্ব না নিলে, শত শত জ্বালানি বোঝাই ট্যাংকার প্রণালি পেরিয়ে বেরিয়ে গেলেও তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ফলে তেল ও অন্যান্য পণ্যের ঘাটতি এবং উচ্চমূল্য কয়েক মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রথমেই পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে বের হতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশেষজ্ঞ ম্যাট স্মিথ।
তিনি বলেন, "প্রায় কেউই এখন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার মতো আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে না।" তার মতে, যেখানে প্রতিদিন সাধারণত ১০০টির বেশি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে, সেখানে তা নেমে এসেছে ১০টি বা তারও কমে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে আস্থা তৈরি হলেও শুরুতে প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জাহাজের সংখ্যাই বেশি থাকবে। স্মিথ বলেন, বর্তমানে উপসাগরে প্রায় ৪০০টি পূর্ণ তেলবাহী ট্যাংকার বের হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, কিন্তু প্রবেশের জন্য প্রস্তুত খালি ট্যাংকার রয়েছে মাত্র প্রায় ১০০টি।
তিনি আরও বলেন, আজই যদি প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়, তবুও তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে জুলাই পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে কনটেইনার জাহাজের ক্ষেত্রেও। এসব জাহাজ উপসাগরীয় দেশগুলোতে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং এই দেশগুলো থেকে সার ও শিল্প কাঁচামাল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের সামুদ্রিক ও বাণিজ্যবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট পিটার টির্শওয়েলের মতে, হরমুজ দিয়ে প্রায় ১০০টি কনটেইনার জাহাজ বের হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও, প্রবেশের জন্য কার্যত কোনো জাহাজ নেই।
এর ফলে অঞ্চলটি থেকে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া প্রায় ৩০ শতাংশ সার কয়েক মাস ধরে আটকে থাকতে পারে, যতক্ষণ না নতুন জাহাজ এসে তা বহন করতে পারে। তেলের মতোই, এই পণ্যগুলো পরিবহনের একমাত্র উপায় হলো জাহাজ।
টির্শওয়েল বলেন, "এই কার্গোগুলো সহজে অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে নতুন করে জাহাজ প্রবেশ না করলে সেখানে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন—যেমন অপরিশোধিত তেল, পেট্রোল, অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি ও সার—স্থবিরই থাকবে।
গত ছয় সপ্তাহে এই পণ্যগুলোর উৎপাদন বন্ধ ছিল, কারণ এগুলো সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না, জানান স্মিথ।
তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদকরা সাধারণত তেল সরাসরি ট্যাংকারে তুলে দ্রুত পাঠাতে অভ্যস্ত। "তাদের উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগবে, পাশাপাশি সেই তেল পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্যাংকারও সেখানে থাকতে হবে।"
