ইরানের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মিসাইল ধ্বংসের বিষয়ে নিশ্চিত যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এক মাস পূর্ণ হতে চলেছে। তবে এখন পর্যন্ত ইরানের বিশাল মিসাইল ভাণ্ডারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করার বিষয়েই নিশ্চিত হতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে অবগত পাঁচটি সূত্র সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর মধ্যে চারজন জানিয়েছেন, আরও এক-তৃতীয়াংশ মিসাইলের অবস্থা সম্পর্কে খুব বেশি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, বোমা হামলার কারণে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে অথবা মাটির নিচের টানেল ও বাঙ্কারে চাপা পড়েছে। সংবেদনশীল তথ্যের কারণে সূত্রগুলো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন।
একটি সূত্র জানায়, ইরানের ড্রোন সক্ষমতার ক্ষেত্রেও গোয়েন্দা তথ্য প্রায় একই রকম। অর্থাৎ, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ড্রোন ধ্বংস হওয়ার বিষয়ে তারা কিছুটা নিশ্চিত।
আগে অপ্রকাশিত এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় যে, ইরানের বেশিরভাগ মিসাইল ধ্বংস বা ব্যবহার অযোগ্য হলেও, তেহরানের কাছে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মিসাইল রয়েছে।
যুদ্ধ থামলে তারা চাপা পড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত মিসাইলের কিছু অংশ হয়তো উদ্ধারও করতে পারবে।
এই গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৃহস্পতিবারের (২৬ মার্চ) বক্তব্যের ঠিক বিপরীত। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, ইরানের কাছে 'খুবই সামান্য রকেট অবশিষ্ট আছে'।
তবে একই সঙ্গে তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় ভবিষ্যতের যেকোনো মার্কিন অভিযানের জন্য অবশিষ্ট ইরানি মিসাইল ও ড্রোনগুলো হুমকি হতে পারে।
রয়টার্স প্রথম জানিয়েছিল যে, হরমুজ প্রণালি বরাবর ইরানের উপকূলে মার্কিন সেনা মোতায়েন করে ট্রাম্প এই সংঘাত আরও বাড়ানোর কথা ভাবছেন কি না।
বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, 'প্রণালি নিয়ে সমস্যা হলো: ধরুন আমরা খুব ভালো কাজ করলাম। আমরা বললাম যে আমরা তাদের ৯৯ শতাংশ (মিসাইল) ধ্বংস করেছি। কিন্তু বাকি ১ শতাংশও অগ্রহণযোগ্য। কারণ ওই ১ শতাংশ মিসাইলই শত কোটি ডলারের একটি জাহাজে আঘাত হানতে পারে।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলা প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে।
তিনি আরও যোগ করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড 'ইরানের ৬৫ শতাংশেরও বেশি মিসাইল, ড্রোন ও নৌ উৎপাদন কেন্দ্র এবং শিপইয়ার্ড ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেছে।'
হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইরাকে চারবার দায়িত্ব পালন করা মেরিন কর্পস ভেটেরান ও ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি শেঠ মৌলটন রয়টার্সের এই তথ্যের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে ট্রাম্পের দাবির বিরোধিতা করেছেন।
মৌলটন বলেন, 'ইরান বুদ্ধিমান হলে তারা তাদের কিছু সক্ষমতা বাঁচিয়ে রাখবে—তারা যা আছে তার সবই ব্যবহার করছে না। তারা সুযোগের অপেক্ষায় আছে।'
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ইরানের মিসাইল
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের নৌবাহিনী ডুবিয়ে দেওয়া, মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে তারা ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করতে চায়।
সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে 'এপিক ফিউরি' নামে পরিচিত তাদের এই অভিযান গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে করা পরিকল্পনার সময়সূচি অনুযায়ী বা তার চেয়েও এগিয়ে রয়েছে।
বুধবার (২৫ মার্চ) পর্যন্ত মার্কিন হামলায় ইরানের ১০ হাজারেরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। সেন্টকমের মতে, ইরানি নৌবাহিনীর বড় জাহাজের ৯২ শতাংশ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোতে হামলার ছবিও প্রকাশ করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে তারা শুধু মিসাইল ও ড্রোনের মজুতই নয়, বরং এগুলো যে শিল্পে তৈরি হয় তারও পিছু নিয়েছে।
তারপরও ইরানের ঠিক কতটা মিসাইল বা ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে সেন্টকম অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, সমস্যার একটি বড় কারণ হলো যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের মাটির নিচের বাঙ্কারগুলোতে ঠিক কতগুলো মিসাইল মজুত ছিল তা নির্ধারণ করা। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ইরানের মিসাইল মজুতের আকার সম্পর্কে তাদের অনুমান প্রকাশ করেনি।
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম এমন ২ হাজার ৫০০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছিল। এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৩৩৫টিরও বেশি মিসাইল লঞ্চার 'নিষ্ক্রিয়' করা হয়েছে, যা ইরানের উৎক্ষেপণ সক্ষমতার ৭০ শতাংশ।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে জানাননি যে তাদের মতে ইরানের কাছে এখনও কতগুলো মিসাইল অবশিষ্ট রয়েছে। তবে তারা একান্তে স্বীকার করেছেন যে, তাদের হিসাব অনুযায়ী ইরানের শেষ ৩০ শতাংশ সক্ষমতা ধ্বংস করা তুলনামূলকভাবে বেশি কঠিন হবে।
এখনও প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে ইরান
মার্কিন হামলার তীব্রতা সত্ত্বেও ইরান প্রমাণ করেছে যে তাদের অস্ত্র এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, শুধু বৃহস্পতিবারই তারা আমিরাতে ১৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ১১টি ড্রোন ছুড়েছে।
তারা নতুন সক্ষমতাও দেখিয়েছে। গত সপ্তাহে ইরানি বাহিনী প্রথমবারের মতো দূরপাল্লার মিসাইল ছুড়ে ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান মিসাইল ফোর্স ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, মার্কিন হামলায় ইরানের সক্ষমতা কতটা কমেছে, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো তা অতিরঞ্জিত করে বলছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ইরান এখনও বিড কানেহ সামরিক স্থাপনা থেকে হামলা চালাতে সক্ষম, যা ব্যাপকভাবে বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল।
গ্রাজেউস্কি বলেন, 'তারা যে এটি টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, তা থেকে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভিযানের সাফল্যকে বাড়িয়ে বলছে।' তিনি মনে করেন, ইরান এখনও তাদের মিসাইল সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ ধরে রেখেছে।
তিনি আরও জানান, ইরানের এক ডজনেরও বেশি বড় আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা রয়েছে যেখানে তারা লঞ্চার ও মিসাইল রাখতে সক্ষম। 'বড় প্রশ্ন হলো: এই স্থাপনাগুলো কি ধসে পড়েছে?'—যোগ করেন তিনি।
ইরানের টানেলিং
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ইরানের মিসাইল সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এর আংশিক কারণ হলো, ঠিক কতগুলো মিসাইল ভূগর্ভে এবং কোনো না কোনোভাবে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে, তা অস্পষ্ট। ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমি জানি না আমরা কখনও এর সঠিক সংখ্যা জানতে পারব কি না।'
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত ১৯ মার্চ এক মন্তব্যে ইরানের টানেলিংয়ের এই চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে বলেন: 'ইরান একটি বিশাল দেশ। আর (গাজায়) হামাস ও তাদের টানেলগুলোর মতোই, তারা যেকোনো সহায়তা, যেকোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মানবিক সহায়তাকে টানেল ও রকেট তৈরিতে ঢেলেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'তবে আমরা পদ্ধতিগতভাবে, নির্মমভাবে এবং অপ্রতিরোধ্যভাবে তাদের খুঁজে বের করছি, যা বিশ্বের অন্য কোনো সামরিক বাহিনী করতে পারবে না, এবং ফলাফলই তার প্রমাণ।' তবে তিনি কত শতাংশ মিসাইল বা ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, তার বিস্তারিত জানাননি।
