দেউলিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: ১৭০ বছর পর কেন বন্ধ হলো এই বিলাসপণ্যের ব্র্যান্ড?
প্রায় ১৬০ বছরের বেশি সময় পর দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ হয়ে গেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। প্রথমবার ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পর কোম্পানিটি বিলুপ্ত হয়। ওই বিদ্রোহ ছিল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটায়।
তবে দ্বিতীয়বার এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ঘটেছে অনেকটা নীরবে। লন্ডনে বিলাসপণ্যের খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরায় চালু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি এবার দেউলিয়া [লিকুইডেশন] হয়ে গেছে।
বর্তমানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক কে?
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারতীয় উদ্যোক্তা সঞ্জীব মেহতা কয়েকজন শেয়ারহোল্ডারের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্বত্ব কিনে নেন। প্রথেমে তারা এটিকে পাইকারি ব্যবসা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন।
২০১০ সালে মেহতা লন্ডনের মে-ফেয়ারে ২ হাজার বর্গফুটের একটি দোকান খুলে বিলাসবহুল খাদ্য ও পানীয় ব্র্যান্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। সেখানে চা, মিষ্টান্নসহ উচ্চমানের নানা পণ্য বিক্রি হতো।
২০১৭ সালে গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেহতা বলেন, 'এখন একজন ভারতীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক, এটি নেতিবাচক ইতিহাসকে ইতিবাচকে পরিণত করেছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার কথা বলে।'
কোম্পানিজ হাউসে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, গত অক্টোবর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড লিকুইডেটর নিয়োগ করে। প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গ্রুপের কাছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি বকেয়া ছিল। মূল কোম্পানিটি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত।
এছাড়া কর বাবদ ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের কাছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫ পাউন্ড পাওনা ছিল।
মেহতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইস্ট ইন্ডিয়া নাম ব্যবহারকারী আরও কয়েকটি কোম্পানিও বিলুপ্ত হয়েছে। কোম্পানিটির ওয়েবসাইট বর্তমানে অকার্যকর।
মে-ফেয়ারের ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে অবস্থিত তাদের সাবেক দোকানটি এখন খালি পড়ে আছে এবং সম্পত্তি সংস্থা সিবিআরই অনলাইনে সেটির বিপণন করছে।
কে এই সঞ্জীব মেহতা?
মুম্বাইয়ের এক গুজরাটি পরিবারে জন্ম নেওয়া সঞ্জীব মেহতা প্রায় এক শতক পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধিগ্রহণ করে এটিকে পুনরায় ব্র্যান্ডিংয়ের চেষ্টা করেন।
তার দাদা গফুরচাঁদ মেহতা ১৯২০-এর দশকে বেলজিয়ামে বসবাস করতেন এবং সেখানে হীরার ব্যবসা শুরু করেন। মুম্বাই থেকে স্নাতক শেষ করে মেহতা লস অ্যাঞ্জেলেসের জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অব আমেরিকায় পড়াশোনা করেন। পরে তিনি বাবার হীরার ব্যবসায় যোগ দেন। ১৯৮৯ সালে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান।
তার শ্বশুর জসুভাই শাহ সোভিয়েত ইউনিয়নে ওষুধপণ্য বিক্রি করতেন, যা ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে মেহতার বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করে।
ব্রিটিশ ও ভারতীয় ব্যবসায়িক ইতিহাসের এক অদ্ভুত-প্রতীকী অধ্যায়ের অবসান
একসময় শীর্ষে থাকা মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বৈশ্বিক বাণিজ্যের ধারা পাল্টে দিয়েছিল, তবে তার মানবিক মূল্য ছিল ভয়াবহ। বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এর ক্ষমতার অবসান ঘটে।
একসময় বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব বিস্তারকারী মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত। উনিশ শতকের শুরুর দিকে তাদের প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যের নিজস্ব বাহিনী ছিল। তবে তাদের ইতিহাস শুধু বিতর্কিতই নয়, অনেকের কাছে আতঙ্কজনকও।
দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অদক্ষতার অভিযোগ ছিল কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। দাস বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। ভারতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকে তীব্রতর করে এমন নীতির জন্যও কোম্পানিকে দায়ী করা হয়, যার ফলে লাখো মানুষের মৃত্যু হয়।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ভারতীয় সৈন্যরা কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ব্রিটিশ রাণী হস্তক্ষেপ করে। কোম্পানিটি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তাদের শাসনের অবসান ঘটে। সম্পদ, সহিংসতা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক জটিল উত্তরাধিকার রেখে যায় তারা, যা আধুনিক বিশ্ব গঠনে প্রভাব ফেলেছে।
দেড় শতাধিক বছর পর পুনরুজ্জীবনের সেই অধ্যায়ও এবার শেষ হলো। তৃতীয়বারের মতো ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
