ওয়াশিংটন পোস্টে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই, চাকরি হারাচ্ছেন ৩০০-র বেশি সাংবাদিক
ব্যাপক ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মালিকানাধীন প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব বিভাগেই প্রভাব পড়েছে। ফলে এই সংবাদমাধ্যমটির মোট কর্মীর এক–তৃতীয়াংশই চাকরি হারাতে যাচ্ছেন।
রয়টার্সের হাতে আসা এক অডিও রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ৩০ শতাংশ ছাঁটাই করেছে। নিউজরুমের প্রায় ৮০০ জন সাংবাদিকের মধ্যে ৩০০ জনের বেশি চাকরি হারিয়েছেন।
পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে কর্মীদের এই দুঃসংবাদ জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক, সম্পাদনা, মেট্রো ও ক্রীড়া বিভাগসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে কর্মী কমানো হচ্ছে। ১৮৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক এই পত্রিকাটি বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই সংকটের কারণে মাত্র কদিন আগেই ২০২৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিক কাভারেজ সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছিল তারা।
কর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে আমরা এমন এক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে চলছিলাম, যা সেই সময়ের জন্য উপযুক্ত ছিল, যখন স্থানীয় সংবাদপত্র হিসেবে আমাদের একচেটিয়া দাপট ছিল। এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন পথ ও আরও শক্ত ভিত্তি প্রয়োজন।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ছাঁটাইয়ের তালিকায় রয়েছেন অ্যামাজন বিটের প্রতিবেদক ক্যারোলিন ও'ডনোভান এবং কায়রো ব্যুরো চিফ ক্লেয়ার পার্কার। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত পত্রিকাটির সব সংবাদকর্মী ও সম্পাদককেও ছাঁটাই করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আজ তারা কিছু কঠিন কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোম্পানিজুড়ে বড় ধরনের পুনর্গঠন চলছে। তাদের লক্ষ্য, পায়ের নিচের মাটি শক্ত করা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার ওপর আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া, যা পাঠকদের আকৃষ্ট করবে।
আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস ইন্টারনেটে পণ্য বিক্রি করে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী হলেও, ইন্টারনেটে কীভাবে একটি লাভজনক সংবাদমাধ্যম টিকিয়ে রাখতে হয়, সেই মন্ত্র এখনো খুঁজে পাননি। ২০১৩ সালে তিনি যখন পত্রিকাটি কিনেছিলেন, এরপর প্রথম আট বছর এর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পত্রিকাটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে ধুঁকছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ২৫ কোটি ডলারে গ্রাহাম পরিবারের কাছ থেকে পত্রিকাটি কিনে নিয়েছিলেন জেফ বেজোস। সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পত্রিকার সাংবাদিকতার ঐতিহ্য তিনি রক্ষা করবেন এবং দৈনন্দিন কাজে হস্তক্ষেপ করবেন না। তবে তিনি সতর্ক করে এটি–ও বলেছিলেন, আগামী বছরগুলোতে 'অবশ্যই পরিবর্তন আসবে'।
ইন্টারনেটের যুগে পাঠকেরা যখন সংবাদের মূল উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে ঝুঁকছেন, ফলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস–এর মতো বড় পত্রিকাগুলোও চিরাচরিত ব্যবসায়িক মডেল টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরেই সংবাদমাধ্যমগুলো টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
কর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে বলেন, 'সব বিভাগেই ছাঁটাইয়ের প্রভাব পড়েছে। তবে আমাদের 'পলিটিকস অ্যান্ড গভর্নমেন্ট' বিভাগটিই হবে পত্রিকার সবচেয়ে বড় ডেস্ক। গ্রাহক বাড়াতে ও ধরে রাখতে এই বিভাগের ওপরই আমরা ভরসা রাখছি।' তবে বর্তমান কাঠামোর ক্রীড়া বিভাগটি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এর আগেও, ২০২৩ সালে প্রায় ১০ কোটি ডলার লোকসানে পড়েছিল পত্রিকাটি। ওই সময় সব বিভাগের কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। গত বছরও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয় এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন অবশ্য বলা হয়েছিল, নিউজরুমে এর প্রভাব পড়বে না।
মালিকপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে 'ওয়াশিংটন পোস্ট গিল্ড'। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে সংগঠনটি বলেছে, 'জেফ বেজোস যদি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পত্রিকার ঐতিহ্যের পেছনে আর বিনিয়োগ করতে না চান, লাখ লাখ পাঠকের সেবায় আগ্রহী না হন, তবে ওয়াশিংটন পোস্টের এমন একজন অভিভাবক প্রয়োজন—যিনি তা করবেন।'
এর আগে গত সপ্তাহে পত্রিকার হোয়াইট হাউস বিটের কর্মীরা বেজোসকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেখানে তারা উল্লেখ করেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও বড় প্রতিবেদনগুলোর জন্য অন্য দলের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, তাদের ছাড়া শক্তিশালী সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিউজরুমের বৈচিত্র্য ধরে রাখা জরুরি বলেও তাঁরা মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বিরোধ বেশ কয়েকবার প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জেফ বেজোসের কড়া সমালোচনা করেছিলেন সাংবাদিকেরা। ওই ঘটনার জেরে দুই লাখের বেশি ডিজিটাল গ্রাহক (সাবস্ক্রিপশন) হারিয়েছিল পত্রিকাটি।
এদিকে মালিক জেফ বেজোসের সঙ্গে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কের রসায়নও আলোচনায় এসেছে। গত বছর ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করতে দেখা গেছে বেজোসসহ প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীকে। ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানেও বেজোসকে বেশ সামনের সারিতে দেখা যায়।
অথচ ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বেজোসের কঠোর সমালোচক ছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট তার বিরুদ্ধে 'অন্যায্য' খবর প্রচার করে—এমন অভিযোগ ছিল ট্রাম্পের। তবে গত বছরের মার্চে সেই সুর পাল্টে ট্রাম্প প্রযুক্তিউদ্যোক্তা বেজোসের প্রশংসা করে বলেন, প্রকাশনাটি নিয়ে বেজোস 'সত্যিই ভালো কাজ' করছেন।
