হাত নেই,পা নেই; ‘ফ্রিকস’ সিনেমার সেই ‘হিউম্যান ক্যাটারপিলার’; শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও যাকে দমাতে পারেনি
১৯৩২ সালে মুক্তি পাওয়া জনপ্রিয় কাল্ট ক্লাসিক 'ফ্রিকস' সিনেমার কথা মনে আছে? সাদা-কালো পর্দায় এই ছবির একটি দৃশ্য আজও দর্শকদের স্তম্ভিত করে দেয়। সিনেমাটির এক দৃশ্যে দেখা যায়—হাত নেই, নেই পা-ও; অথচ এক ব্যক্তি কেবল মুখ আর জিহ্বা ব্যবহার করে অত্যন্ত সাবলীলভাবে সিগারেট তৈরি করছেন, এরপর নিজের ঠোঁট দিয়েই দেশলাই জ্বালিয়ে তাতে আয়েশি ভঙ্গিতে সুখটান দিচ্ছেন। সিনেমার এই বিস্ময়কর মানুষটির নাম 'প্রিন্স রেন্ডিয়ান'।
অনেকের কাছেই নামটি হয়তো বেশ অপরিচিত। আগে বরং 'ফ্রিকস' সিনেমাটি নিয়ে একটু আলাপ করা যাক। বর্তমান যুগের বাঘা বাঘা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছেও 'ফ্রিকস' এক বিশাল অনুপ্রেরণা। অস্কারজয়ী প্রখ্যাত নির্মাতা গুইয়েরমো দেল তোরো এই ছবির একজন একনিষ্ঠ অনুরাগী। প্রায়ই তিনি ছবিটিকে তাঁর অন্যতম প্রিয় সিনেমা হিসেবে উল্লেখ করেন। অথচ এই ছবি তৈরির শুরুর গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। ছবির মূল প্লট শোনার পর সেই সময়কার অনেক অভিনয়শিল্পীই এতে কাজ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
সিনেমা ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ছবিটি আজও দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রাখে। সমকালীন সমাজ নিয়ে ছবিটির করা সমালোচনাগুলো এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে বর্তমানের দর্শকেরা পর্দায় যা দেখছেন, তা মূলত মূল সিনেমার একটি অংশমাত্র। সেন্সরশিপের কারণে পরিচালক টড ব্রাউনিং আসলে যা দেখাতে চেয়েছিলেন, তা কখনোই পুরোপুরি পর্দায় আসেনি।
তবে সব ছাপিয়ে এই সিনেমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল গায়ানার এক অসাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশ্বের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। গায়ানার মানুষেরা বরাবরই দেশ-বিদেশে নানা ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। শিল্পকলা বা বিনোদন জগৎও এর ব্যতিক্রম নয়। রুপালি পর্দা থেকে শুরু করে টেলিভিশন—সবখানেই রয়েছে তাঁদের পদচারণ। আজ থেকে এক শতাব্দী আগে প্রিন্স রেন্ডিয়ান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত 'বার্নাম অ্যান্ড বেইলি' সার্কাসের মূল আকর্ষণ। বাস্তবের আরও অনেক সার্কাস শিল্পীর সঙ্গে তিনিও 'ফ্রিকস' সিনেমায় অভিনয় করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
মঞ্চে তাঁর নামের অভাব ছিল না। কখনো তিনি 'দ্য স্নেক ম্যান',কখনো 'দ্য হিউম্যান টরসো', আবার কখনোবা 'দ্য হিউম্যান ক্যাটারপিলার'। নাম যা-ই হোক না কেন, যখন মঞ্চের পর্দা উঠত, স্পটলাইটের আলোয় দর্শকরা যা দেখতেন তার জন্য তাঁরা মোটেও প্রস্তুত থাকতেন না।
তিন ফুটের চেয়েও কম উচ্চতার এই মানুষটির শারীরিক গঠন ছিল অদ্ভুত। হাত বলতে কেবল কাঁধের কাছে সামান্য মাংসপিণ্ড, আর পা বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। লাল-সাদা ডোরাকাটা পোশাক পরে তিনি যখন মঞ্চে আসতেন, মানুষের চেয়ে তাঁকে শুঁয়োপোকাই বেশি মনে হতো!
তারপর ১৮৮৯ সালের কথা। বিদেশ ভ্রমণের সময় প্রখ্যাত সার্কাস ও বিনোদন উদ্যোক্তা পি টি বার্নামের নজরে পড়েন ১৮ বছর বয়সী তরুণ প্রিন্স রেন্ডিয়ান। জন্ম থেকেই হাত-পা না থাকার মতো কঠিন বাস্তবতাকে রেন্ডিয়ান যেভাবে জয় করেছিলেন, তা দেখে মুগ্ধ হন বার্নাম। দেরি না করে তিনি রেন্ডিয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন এবং নিজের বিখ্যাত সার্কাস দলে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
সার্কাসের মঞ্চজুড়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা আর কেবল মুখের সাহায্যে একের পর এক অদ্ভুত সব কলাকৌশল দেখানোই ছিল রেন্ডিয়ানের কাজ। হাত-পা না থাকা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে নিখুঁতভাবে নিজের প্রাত্যহিক কাজগুলো করতেন, তা দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেতেন উপস্থিত দর্শকরা।
মঞ্চে তাঁকে 'শুঁয়োপোকা' সাজিয়ে দর্শকদের সামনে আনা হলেও, ব্যক্তিগত জীবনে প্রিন্স রেন্ডিয়ান ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সংসারি একজন মানুষ। ১৮৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে তিনি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে থাকতেন। তাঁর জন্ম ব্রিটিশ গায়ানার ডেমেরারায়।
রেন্ডিয়ানের ছোটবেলার জীবন নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকি তাঁর আসল নাম কী ছিল, সেটিও আজ অজানা। তিনি 'টেট্রা-অ্যামেলিয়া সিনড্রোম' নামের এক বিরল জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মেছিলেন। এটি অত্যন্ত বিরল একটি শারীরিক অবস্থা। এই অবস্থায় জন্মালে অনেকেই ধরে নিতেন, মানুষটি সারাজীবন পরনির্ভরশীল থাকবে। এবং এই সমস্যার কারণেই হাত-পা ছাড়াই জন্মান তিনি। সার্কাসের বার্নামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রেন্ডিয়ান ছিলেন একজন হিন্দু এবং তিনি হিন্দি ভাষায় কথা বলতেন। তবে অবাক করার বিষয় হলো, লোকচক্ষুর অন্তরালে তিনি ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ এবং জার্মান ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা রেন্ডিয়ানের স্বাভাবিক জীবনে কখনোই বাধা হতে পারেনি। সার্কাসে ক্যারিয়ার শুরুর আগেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন প্রিন্সেস সারাহর সঙ্গে। তাঁদের সংসারে ছিল চার সন্তান—তিন মেয়ে মেরি, এলিজাবেথ ও উইলহেলমিনা এবং এক ছেলে রিচার্ড।
ভাগ্য অন্বেষণে রেন্ডিয়ান যখন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, পরিবারও ছিল তাঁর সফরসঙ্গী। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তাঁরা নিউ জার্সির প্লেইনফিল্ডের এক নিরিবিলি এলাকায় বসতি গড়েন। মঞ্চের সেই 'অদ্ভুত' মানুষটি সেখানে আর দশজনের মতো সবার সঙ্গে মিলেমিশে এক অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন।
মঞ্চে রেন্ডিয়ানের পারফরম্যান্স ছিল সাদামাটা, কিন্তু অবিশ্বাস্য। সার্কাসের অন্যান্য 'বিচিত্র' শিল্পীর মতো তিনি কেবল সঙ সেজে দাঁড়িয়ে থাকতেন না। বরং একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হাত দিয়ে যে কাজগুলো করেন, তিনি সেগুলোই করে দেখাতেন কেবল মুখ দিয়ে।
জন্মগতভাবেই হাত-পা না থাকায় ছোটবেলা থেকেই নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলেছিলেন রেন্ডিয়ান। নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখা থেকে শুরু করে সুস্থ থাকার সব কৌশলই ছিল তাঁর নখদর্পণে।
রেন্ডিয়ানের সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌশল ছিল মুখ দিয়ে সিগারেট বানানো। তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে কেবল ঠোঁট ও জিভ ব্যবহার করে তামাক ও কাগজ দিয়ে সিগারেট পাকাতেন। এরপর দাঁত দিয়ে দিয়াশলাইয়ের কাঠি ও সিগারেট—দুটোই চেপে ধরতেন। দেশলাই জ্বালিয়ে সিগারেটে আগুন ধরানো এবং ধোঁয়ার সঙ্গে ফুঁ দিয়ে কাঠিটি নেভানোর দৃশ্য দেখে দর্শকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতেন।
শুধু সিগারেট ধরানোই নয়, আরও অনেক কিছু করতে পারতেন রেন্ডিয়ান। তিনি দাঁত দিয়ে কলম বা তুলি চেপে ধরে অনায়াসেই লিখতে বা ছবি আঁকতে পারতেন। তাঁর এই অবিশ্বাস্য দক্ষতা ১৯৩২ সালের বিখ্যাত 'ফ্রিকস' চলচ্চিত্রেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। রুপালি পর্দায় এটিই ছিল রেন্ডিয়ানের প্রথম ও শেষ উপস্থিতি।
তবে তাঁর দক্ষতার তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল দাড়ি কামানো। হাত ছাড়াই তিনি নিজে নিজে শেভ করতেন। তবে তাঁর দাড়ি কাটার কৌশলটি ছিল ভিন্ন। একটি কাঠের ব্লকের ওপর ক্ষুর বা রেজর শক্ত করে আটকানো থাকত। হাত দিয়ে রেজর চালানোর সুযোগ ছিল না বলে তিনি ক্ষুরের ওপর নিজের মুখটিই ঘষে ঘষে দাড়ি কাটতেন। তাঁর ছবির দিকে তাকালেই বোঝা যায় তিনি এই কাজে কতটা পটু ছিলেন। কারণ তাঁর দাড়ি-গোঁফ সব সময় থাকত একদম পরিপাটি।
এখানেই শেষ নয়, রেন্ডিয়ান যে কতটা স্বাবলম্বী ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে তাঁর ব্যবহৃত আসবাবপত্রেও। রং করার তুলি, দাড়ি কাটার সরঞ্জাম কিংবা তামাক রাখার জন্য তিনি চমৎকার একটি কাঠের বাক্স ব্যবহার করতেন। রেন্ডিয়ানের দাবি, বাক্সটি তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন। এমনকি সেই বাক্সের সামনে একটি তালাও লাগানো ছিল। হাত না থাকা একজন মানুষের পক্ষে কাঠের বাক্স বানানো এবং তাতে তালা লাগানো ছিল এক অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও রেন্ডিয়ান ছিলেন বেশ রসবোধসম্পন্ন মানুষ। 'ফ্রিকস' সিনেমার একটি মজার ঘটনা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। শুটিং চলাকালে এক ভাঁড় (ক্লাউন) রেন্ডিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নতুন সব কসরত নিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলেন। সব শুনে রেন্ডিয়ান তাঁর চিরাচরিত রসিকতায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, 'সবই তো বুঝলাম, কিন্তু আপনার এই বিদঘুটে ভ্রু দুটো নিয়ে কি কোনো কসরত দেখাতে পারবেন না?'
দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সার্কাস ও বিভিন্ন শোতে পারফর্ম করেছেন রেন্ডিয়ান। ১৯৩৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর জীবনের শেষ শোটি শেষ করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি চিরবিদায় নেন। ৬৩ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় এই লড়াকু মানুষের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচা যায়, রেন্ডিয়ান ইতিহাসে তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছেন।
সূত্র: অল দ্যাটস ইন্টারেস্টিং, ওয়ার্ডপ্রেস
