৫০ বছর পর চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি: লঞ্চ প্যাডে নাসার মেগা রকেট ‘আর্টেমিস-২’
ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল এখন সাজ সাজ রব। নাসার সেই বিশাল 'মেগা রকেট' পৌঁছে গেছে উৎক্ষেপণ মঞ্চে। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর আবার চাঁদের পানে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতির শেষ তুলিটি এখন টানা হচ্ছে।
প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে চলল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ৯৮ মিটার (৩২২ ফুট) উঁচু আকাশচুম্বী 'স্পেস লঞ্চ সিস্টেম' রকেটটিকে খাড়াভাবে নিয়ে যাওয়া হলো। 'ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং' থেকে ৪ মাইল বা সাড়ে ৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি এখন দাঁড়িয়ে আছে লঞ্চ প্যাডে।
এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ঘষামাজা। চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর 'ড্রেস রিহার্সাল' শেষে মিলবে ওড়ার অনুমতি। ১০ দিনের এই 'আর্টেমিস-২' মিশনে চারজন নভোচারী চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসবেন। নাসা জানিয়েছে, রকেটটি উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য প্রথম তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি। তবে কোনো কারণে মিস হলে ফেব্রুয়ারি, মার্চ বা এপ্রিলেও সুযোগ থাকছে।
শামুকগতির এক রাজকীয় যাত্রা
স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪ মিনিটে শুরু হয় রকেটের এই যাত্রা, আর কেনেডি স্পেস সেন্টারের প্যাড ৩৯বি-তে এটি পৌঁছায় সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে। এই বিশাল রকেটটি বহন করে নিয়ে যায় 'ক্রলার-ট্রান্সপোর্টার' নামের এক দানবীয় বাহন। এর সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ১.৩ কিলোমিটার (০.৮২ মাইল)! শামুকগতির এই দৃশ্য সরাসরি উপভোগ করেছেন অসংখ্য মানুষ।
নাসা জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন ধরে রকেটটিতে জ্বালানি ভরা এবং কাউন্টডাউন বা সময় গণনার মহড়া চলবে। যাকে তারা বলছেন 'ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল'।
কেনেডি স্পেস সেন্টারে দাঁড়িয়ে রকেটের এই যাত্রা দেখেছেন আর্টেমিস-২ এর চার সাহসী নভোচারী—নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ। তারপরেই রকেটের চূড়ায় থাকা মহাকাশযানে চড়ে তারা পাড়ি দেবেন অজানায়। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে 'অ্যাপোলো-১৭' মিশনের পর এই প্রথম মানুষ চাঁদের অভিযানে যাচ্ছে।
অজানার পথে, তবে অবতরণ নয়
নাসা বলছে, এই মিশন নভোচারীদের মহাকাশের এমন এক দূরত্বে নিয়ে যাবে, যেখানে আগে কেউ কখনো যায়নি। তবে আর্টেমিস-২ সরাসরি চাঁদের বুকে নামবে না। এটি মূলত ২০২৭ সালে (বা বিশেষজ্ঞদের মতে ২০২৮ সালে) 'আর্টেমিস-৩' মিশনের মাধ্যমে মানুষের চাঁদে অবতরণের পথ তৈরি করে দেবে।
বিশাল এই রকেট দেখে মুগ্ধ নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ। তিনি বলেন, 'উৎক্ষেপণের দিন নভোচারীরাই সবচেয়ে বেশি শান্ত থাকেন। কারণ আমরা এই মিশনের জন্য, এই কাজটির জন্যই নিজেদের তৈরি করেছি।'
অন্যদিকে কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনের আশা, এই মিশন বিশ্বকে নতুন করে জাগাবে। তার কথায়, 'সারা জীবন চাঁদকে শুধু দূর থেকেই দেখেছি। কিন্তু এখন মানুষ যখন চাঁদের উল্টো পিঠ ঘুরে আসবে, তখন মানবতার জন্য তা হবে এক বিশাল ব্যাপার।'
চাঁদের উদ্দেশে ছোটার আগে মিশনের প্রথম দুদিন মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথেই ঘুরবে। পৃথিবী থেকে ৪০ হাজার মাইল উঁচুতে উঠে তারা যাচাই-বাছাই করবেন—যা চাঁদের দূরত্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
ক্রিস্টিনা কচ বিবিসিকে বলেন, 'আমরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ৪০ হাজার মাইলের কক্ষপথে ঢুকে পড়ব। জানালা দিয়ে পৃথিবীকে একটি আস্ত বলের মতো দেখতে পাব। এই দৃশ্য আগে আমরা কেউ এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিনি।'
এরপর তারা পাড়ি দেবেন আড়াই লাখ মাইলের পথ। পথে চলবে নানা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। চাঁদের উল্টো পিঠ বা 'ফার সাইড' দিয়ে ঘোরার সময় তারা টানা তিন ঘণ্টা ধরে চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করবেন, ছবি তুলবেন এবং এর ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে গবেষণা করবেন। এটি ভবিষ্যতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের পরিকল্পনা সাজাতে সাহায্য করবে।
জার্মান প্রযুক্তির ছোঁয়া
নভোচারীরা যে 'অরিয়ন' মহাকাশযানে চড়ে যাবেন, তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরি হয়েছে জার্মানির ব্রেমেনে। এটি হলো 'ইউরোপীয় সার্ভিস মডিউল', যা ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির পক্ষ থেকে এয়ারবাস তৈরি করেছে।
এয়ারবাসের প্রকৌশলী সিয়ান ক্লিভার বলেন, 'এই মডিউলটি ছাড়া চাঁদে যাওয়া অসম্ভব। এটিই অরিয়ন মহাকাশযানকে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার শক্তি বা প্রপালশন দেবে।'
শুধু তা-ই নয়, এর বিশাল সোলার প্যানেল মহাকাশযানের বিদ্যুৎ তৈরি করবে। ক্লিভার আরও জানান, এতে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এবং পানির বিশাল ট্যাংক রয়েছে, যা মিশনে নভোচারীদের বাঁচিয়ে রাখতে সব রসদ জোগাবে।
ল্যাবের ভেতর প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যে ভবিষ্যতের আর্টেমিস মিশনের জন্য আরও মডিউল বানাচ্ছেন। প্রতিটি বানাতে ১৮ মাস লাগলেও এর নকশায় ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার ঘণ্টা। কারণ মহাকাশে ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। ক্লিভার বলেন, 'আমাদের নভোচারীদের চাঁদে নিয়ে আবার নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে হবে।'
নিরাপত্তাই শেষ কথা
রকেট এখন প্যাড ৩৯বি-তে। আর্টেমিস টিম দিনরাত কাজ করছে ওড়ার প্রস্তুতির জন্য। মিশনটি ইতিমধ্যে কয়েক বছর পিছিয়েছে, তাই নাসার ওপর দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ রয়েছে। কিন্তু নাসা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।
মিশন ম্যানেজমেন্ট টিমের প্রধান জন হানিকাট বলেন, 'আমার একটাই কাজ—রিড, ভিক্টর, ক্রিস্টিনা আর জেরেমিকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। আমরা যখন পুরোপুরি প্রস্তুত হবো, তখনই উড়ব। ক্রুদের নিরাপত্তাই আমাদের কাছে ১ নম্বর অগ্রাধিকার।'
