সৌদি আরবে চলতি বছরে রেকর্ড মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, অধিকার গোষ্ঠীগুলোর নিন্দা
সৌদি আরবে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা রিপ্রাইভের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ৩৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। খবর বিবিসি'র।
সৌদি আরবে ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া মোট মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ছিল ৩৪৫টি। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছে মানবাধিকার সংস্থা রিপ্রাইভ। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বহু বন্দিই সংস্থাটির মক্কেল।
রিপ্রাইভ জানিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে এটিই 'সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর'।
সবশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই পাকিস্তানি নাগরিকের। চলতি বছরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন একজন সাংবাদিক এবং দুজন তরুণ। তারা অভিযোগ অনুযায়ী অপরাধের সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। এছাড়া পাঁচজন নারীও রয়েছেন এই তালিকায়।
রিপ্রাইভের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই (প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) প্রাণঘাতী নয় এমন মাদক সংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। জাতিসংঘ বলছে, এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া 'আন্তর্জাতিক নীতি ও মানদণ্ডের পরিপন্থী'।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অর্ধেকেরও বেশি ছিলেন বিদেশি নাগরিক, যাদের মূলত দেশটির তথাকথিত 'মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'-এর অংশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে বিবিসি মন্তব্য চাইলেও, সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
রিপ্রাইভের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক প্রধান জিদ বাসিউনি বলেন, 'সৌদি আরব এখন সম্পূর্ণ দায়মুক্তির পরিবেশে কাজ করছে। এটি মানবাধিকার ব্যবস্থাকে কার্যত উপহাস করার শামিল।'
তিনি সৌদি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়কে একটি 'নিত্যনৈমিত্তিক' চর্চা হিসেবে বর্ণনা করেন। বাসিউনি এই পরিস্থিতিকে 'নিষ্ঠুর ও নির্বিচার দমন-পীড়ন' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে নিরপরাধ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষরা ফেঁসে যাচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার ইসাম আল-শাজলি নামে এক তরুণ মিশরীয় জেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২১ সালে সৌদি জলসীমা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেছিলেন, তাকে জোর করে মাদক পাচারে বাধ্য করা হয়।
রিপ্রাইভ জানায়, মোট ৯৬টি মৃত্যুদণ্ড শুধুমাত্র 'হাশিশ' সংশ্লিষ্ট মামলায় কার্যকর হয়েছে।
জিদ বাসিউনি বলেন, 'কার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে, সেটি তাদের কাছে মুখ্য নয়। তারা মূলত সমাজের উদ্দেশে এই বার্তাই দিতে চায় যে—প্রতিবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা মাদক—যেকোনো ইস্যুতেই তারা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।'
২০২২ সালের শেষের দিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর আরোপিত একটি অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করার পর থেকেই মাদক সংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এই সিদ্ধান্তকে 'অত্যন্ত দুঃখজনক' বলে অভিহিত করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের স্বজনরা বিবিসিকে তাদের বর্তমান 'ভয়াবহ আতঙ্কগ্রস্ত' জীবনের কথা জানিয়েছেন। তাদের একজন বলেন, 'সপ্তাহে শুধু শুক্র ও শনিবার আমি ঘুমাতে পারি, কারণ ওই দুই দিনে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না।'
রিপ্রাইভের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর একসঙ্গে কারাবন্দী থাকা বন্দীদের সঙ্গীরা তাদের আর্তচিৎকার করতে করতে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যেতে দেখেছেন।
মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৭ সালে 'ক্রাউন প্রিন্স' (যুবরাজ) হওয়ার পর গত কয়েক বছরে দেশটিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। একদিকে তিনি সামাজিক নানা বিধিনিষেধ শিথিল করেছেন, অন্যদিকে একই সঙ্গে সমালোচকদের কণ্ঠরোধও করেছেন।
অর্থনীতিকে তেলের ওপর নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে সৌদি আরবকে তিনি বহির্বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করেন। রাস্তাঘাট থেকে ধর্মীয় পুলিশ সরিয়ে দেওয়া হয়, নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'-এর মতে, দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনও 'ভয়াবহ'। বিশেষ করে উচ্চ হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া এখন বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেবল চীন ও ইরানই সৌদি আরবের চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সৌদি আরব বিষয়ক গবেষক জোয়ি শেয়া বলেন, 'এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তার প্রশাসনকে কোনো মাশুল দিতে হচ্ছে না। বিনোদনমূলক ও খেলাধুলার নানা আয়োজন কোনো বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে চলছে।'
মানবাধিকার সংগঠন রিপ্রাইভ-এর তথ্যমতে, যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তাদের পরিবারকে সাধারণত আগে থেকে কিছু জানানো হয় না। এমনকি মরদেহ হস্তান্তর করা হয় না কিংবা কোথায় দাফন করা হয়েছে, সে তথ্যও পরিবারকে দেওয়া হয় না।
সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি প্রকাশ করে না। তবে ধারণা করা হয়, শিরশ্ছেদ অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে এসব দণ্ড কার্যকর করা হয়।
বিবিসির কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ড. মরিস টিডবল-বিঞ্জ সৌদি আরবে অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত এবং পরবর্তী সময়ে তা সম্পূর্ণভাবে বাতিলের আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নীতিমালা যেমন, কার্যকর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি নাগরিকদের জন্য কনস্যুলার সেবা প্রদান—মেনে চলার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি পরিবারকে দ্রুত অবহিত করা, অবিলম্বে মরদেহ ফেরত দেওয়া এবং নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত পূর্ণ তথ্য প্রকাশের দাবিও জানান।
চলতি বছর যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের মধ্যে সৌদি নাগরিক আব্দুল্লাহ আল-দেরাজি ও জালাল আল-লাবাদ ছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তারা দুজনই অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন।
২০১১ ও ২০১২ সালে শিয়া মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি সরকারের আচরণের প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভে অংশ নেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহতদের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। পরে সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিচারকে 'চরম অন্যায়' বলে অভিহিত করেছে এবং জানিয়েছে, এটি মূলত নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা 'স্বীকারোক্তির' ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও তাদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিলেন।
গত জুনে সাংবাদিক তুর্কি আল-জাসারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায়ও নিন্দা জানায় জাতিসংঘ। ২০১৮ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার কিছু লেখার দায়ে সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ইউনেস্কোর মহাপরিচালক অড্রে আজোলে বলেন, 'সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের চরম দণ্ড মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর একটি বড় আঘাত।'
'রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স' জানায়, মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় আসার পর তুর্কি আল-জাসারই প্রথম সাংবাদিক, যার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। যদিও ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে সৌদি এজেন্টরা হত্যা করেছিল।
গত ডিসেম্বরে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩২ জন মিশরীয় ও একজন জর্ডানীয় নাগরিকের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষকে উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি পাঠান। অভিযোগ ছিল, তাদের কোনো আইনি প্রতিনিধি ছিল না। এরপর থেকে তাদের অধিকাংশেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
চলতি বছর মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এক ব্যক্তির এক আত্মীয় বলেন, তার স্বজন তাকে জানিয়েছিলেন যে, মানুষকে 'ছাগলের মতো ধরে নিয়ে গিয়ে' হত্যা করা হচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিবিসি সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লেখা এক চিঠিতে জাতিসংঘের বিশেষ দূতের উদ্বেগের জবাবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, সৌদি আরব মানবাধিকার 'রক্ষা ও বজায় রাখে' এবং তাদের আইন 'নির্যাতন নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য' করেছে।
ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, 'মৃত্যুদণ্ড কেবলমাত্র সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এবং অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কার্যকর করা হয়। আদালতের সব পর্যায়ের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই দণ্ড দেওয়া বা কার্যকর করা হয় না।'
