জার্মানদের বিশ্বাস, তাদের রুটি গুণে, মানে বিশ্বসেরা; যেকারণে সেটা সত্যি হতে পারে!
ফ্রান্সের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাতে সরু ব্যাগেট নামক রুটি নিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের ছবি, কিংবা মাথায় বাহারি টুপি পরে রুটি বোঝাই সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। সিনেমার এই সুন্দর ফ্রেম ছেড়ে যদি আসল কথায় আসা যায় তাহলে মানতেই হবে, বিশ্বের সেরা রুটির ঠিকানা জার্মানি। এখানে রুটিই যেন আক্ষরিক অর্থে জার্মান সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
রুটির বৈচিত্র্যের দিক থেকে জার্মানিকে টেক্কা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। জার্মান ব্রেড ইনস্টিটিউট (হ্যাঁ, এমন একটি আস্ত সংস্থাই আছে!) এর হিসাব বলছে, দেশে এখন ৩,২০০ টিরও বেশি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত রুটির প্রকারভেদ রয়েছে। আর এই কারণেই ২০১৫ সালে ইউনেস্কো জার্মান রুটি সংস্কৃতিকে 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছে।
জার্মানদের জীবনে রুটি কতটা জড়িয়ে আছে, তা বোঝাতে একটি শব্দই যথেষ্ট: তাদের ভাষায় কাজের একটি প্রতিশব্দ হলো 'ব্রোটারভের্ব', যার আক্ষরিক অর্থ হলো 'রুটি অর্জন করা'।
জার্মানির প্রায় প্রতিটি খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো রুটি: সকালের নাস্তায়, কাজের ফাঁকের টিফিনে (যাকে বলা হয় 'পাউজেনব্রোট' বা 'বিরতির রুটি'), এবং রাতের খাবারে, যার নাম 'আবেন্ডব্রোট' অর্থাৎ 'সন্ধ্যার রুটি'।
জার্মানিতে কোনো জিনিস খুব দ্রুত বিক্রি হলে বলা হয়, 'এটা তো স্লাইস করা রুটির মতো বিক্রি হচ্ছে!'
এমনকি টেলিভিশনের জগতেও রুটির তারকাখ্যাতি কম নয়! 'বের্ন্ড' নামে কথা বলা এক পাউরুটি জার্মান শিশুদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় এক চরিত্র। ২০০০ সাল থেকে শিশুদের চ্যানেলে 'বের্ন্ড ডাস ব্রোট' নামে একটি কমেডি সিরিজও প্রচারিত হচ্ছে।
আর হ্যাঁ, ২০১৮ সালে জার্মান ডাক বিভাগ 'জার্মান রুটি সংস্কৃতি' স্লোগানসহ একটি বিশেষ ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছে।
কিন্তু কেন জার্মানরা পাউরুটি, প্রেটজেল আর রোলের জন্য এতটা পাগল?
রুটির এই বিশাল বৈচিত্র্যের কারণটা লুকিয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত জার্মানির খণ্ড-বিখণ্ড ইতিহাসে। সে সময় জার্মানি ছিল শত শত ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত, যাদের প্রত্যেকের ছিল নিজস্ব সংস্কৃতি, উপভাষা এবং অবশ্যই, নিজস্ব ধরনের রুটি।
এর সাথে মধ্যযুগে যোগ হয়েছিল সফল ব্যবসায়ী শহরগুলো, যারা সেরা মানের বেকড পণ্য তৈরি করে নতুন অভিবাসী ও বাণিজ্য আকর্ষণ করত।
ফ্রান্স বা ইতালির মতো ঝলমলে রোদ জার্মানিতে ততটা মেলে না, তাই অনেক জায়গায় গম ভালো ফলে না। এর বদলে রাই এবং স্পেল্টের মতো শস্য এখানে রাজত্ব করত, আর তা দিয়ে তৈরি রুটি আজও জার্মানির ঐতিহ্য। গমের রুটিগুলো মূলত মিউনিখ এবং স্টুটগার্টের মতো দক্ষিণের শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তবে রুটির এই প্রাচুর্যের আসল চালিকাশক্তি ছিল ঠান্ডা আবহাওয়ার বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই। কৃষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শাসক—সবারই এমন পুষ্টিকর খাবার দরকার ছিল যা শরীরকে শক্তি জোগাবে। তাই জার্মানরা আজও শস্য ও বীজে ভরপুর, ভারী এবং পুষ্টিকর রুটি খায়, যা ইতালির তুলতুলে ফোকাচ্চা বা চাবাটার চেয়ে ওজনেও (আক্ষরিক অর্থেই) অনেক বেশি।
এই ভারী রুটির কদর ইউরোপের অন্য কোথাও তেমন একটা হয়নি। ১৭৯২ সালের এক মজার ঘটনা আছে: বিখ্যাত জার্মান লেখক ইয়োহান ভলফগ্যাং ফন গ্যোটে দুজন ফরাসি বন্দীকে তার নিজের কালো রাইয়ের রুটি খেতে দিয়েছিলেন, আর তা মুখে দিয়েই তারা ভয়ে সোজা পালিয়ে নিজেদের শিবিরে ফিরে গিয়েছিল!
রুটির রাজত্ব
আজকের দিনে যখন অন্যান্য দেশের রাস্তাঘাট ট্যাকো বা বার্গারের ফুড ট্রাকে ভর্তি, তখনও জার্মানি তার ঐতিহ্যবাহী বেকারিগুলোতে বিশ্বস্ত। এই বেকারিগুলোতে পাওয়া যায় 'বেলেগটে ব্রোটশেন' বা বিভিন্ন পুর ভরা রোল—এটাই জার্মানির আসল ফাস্ট ফুড।
প্রথমবার কোনো জার্মান বেকারিতে ঢুকলে রুটির সম্ভার দেখে আপনার মাথা ঘুরে যেতে পারে: কৃষকের রুটি, মিশ্র রুটি, পাথরের ওভেনের রুটি, সূর্যমুখী রুটি, কুমড়োর রুটি, পাঁচ-বীজের রুটি—কী নেই সেখানে!
কিন্তু এই বিশাল সম্ভার দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। শুধু একটি স্থানীয় 'বেকারাই' বেকারিতে ঢুকে পড়ুন আর নিজেই দেখুন। এখানকার প্রতিটি জিনিসই জিভে জল আনার মতো। আর আপনার যদি মিষ্টির শখ থাকে, তবে জেনে রাখুন, বেশিরভাগ বেকারির সাথেই একজন 'কন্ডিতর' বা কেক-পেস্ট্রি বিশেষজ্ঞ থাকেন।
স্বাস্থ্যকর খাবারের এই যুগের অনেক আগে থেকেই জার্মানরা পুষ্টিকর হোল-গ্রেইন রুটি তৈরি করে আসছে। যদিও এখন কিছু সুপারমার্কেট নিজেরাই রুটি তৈরি করে, তবুও বেশিরভাগ জার্মান তাদের পাড়ার মোড়ের বেকারির ওপরই আস্থা রাখে।
বেকারিতে রুটি প্রস্তুতকারক হওয়া জার্মানিতে আজও অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পেশা।এখানে তারা যে উচ্চ-স্তরের সৃজনশীল প্রশিক্ষণ পায়, তা অন্য অনেক দেশেই বিরল।
যদিও আজকাল তরুণদের মধ্যে এই কঠোর পেশায় আসার আগ্রহ কম, তবুও রুটি আজও জার্মান খাদ্যাভ্যাস এবং সংস্কৃতির মূলে রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে নতুনত্ব আসছে না। হামবুর্গ, বার্লিন বা মিউনিখের মতো আধুনিক শহরগুলোতে 'তসাইট ফুর ব্রোট' বা 'সোলুনা ব্রোট উন্ড ওল'-এর মতো বেকারিগুলো প্রাকৃতিক এবং স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে নতুন স্বাদের রুটি তৈরি করছে—অবশ্যই জার্মান কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে অটুট রেখেই।
জার্মানিতে রুটির গুণমান ও আকারের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মকানুনও রয়েছে এবং প্রতি বছর জার্মান ব্রেড ইনস্টিটিউট 'বর্ষসেরা রুটি' ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের জন্য বর্ষসেরা রুটি হলো 'নুসব্রোট' বা বাদামের রুটি।
যে জার্মান রুটিগুলো খেয়ে দেখতেই হবে
ব্রোটশেন (Brötchen - ব্রেড রোল): এটি হলো ক্লাসিক সাদা ব্রেড রোল। তবে জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিভিন্ন নাম, যেমন: জেমেল্ন, ভেকেন, বা শ্রিপেন। তিল, পোস্ত বা কুমড়োর বীজ দেওয়া হোল-গ্রেইন রোলও পাওয়া যায়।
মিল্খব্রোটশেন (Milchbrötchen - দুধের রোল): দুধ দিয়ে বানানো তুলতুলে নরম এই রুটিতে প্রায়শই কিসমিস বা চকোলেট চিপস মেশানো হয়, যা জার্মান শিশুদের সকালের নাস্তায় ভীষণ প্রিয়।
হ্যর্নশেন (Hörnchen): সকালের নাস্তার (বিশেষ করে রবিবারের) আরেকটি তারকা হলো 'হ্যর্নশেন' বা 'ছোট শিং'। একে ফরাসি ক্রোসাঁ-র জার্মান সংস্করণ বলা চলে, তবে এতে মাখনের পরিমাণটা একটু বেশিই থাকে। জ্যাম বা চকোলেট স্প্রেড দিয়ে এর স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো।
ফোলকর্নব্রোট (Vollkornbrot - হোল গ্রেইন রুটি): জার্মান বেকারির তাক জুড়ে থাকা গাঢ় বাদামী রঙের স্বাস্থ্যকর রুটিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। আইন অনুযায়ী, একটি রুটিকে ফোলকর্নব্রোট হতে হলে এতে কমপক্ষে ৯০% হোল-গ্রেইন আটা থাকতেই হবে।
পাম্পারনিকেল (Pumpernickel): ১০০% রাই দিয়ে তৈরি, জার্মানির উত্তরাঞ্চলের এই বিখ্যাত রুটিটি কম আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে বেক করা হয়। এর স্বাদ অনন্য এবং প্রায়শই শসা বা মাছের সাথে খাওয়া হয়।
রোগেনব্রোট (Roggenbrot - রাই রুটি): পাম্পারনিকেল ছাড়া অন্য যেকোনো রাই রুটিকে এটি বলা হয়। অঞ্চলভেদে এর ঘনত্ব ও রঙে অনেক পার্থক্য দেখা যায়।
কাটেনব্রোট (Katenbrot): এর অর্থ 'খামারের রুটি'। এই গাঢ় বাদামী, মোটা দানার রুটিটি রাতের খাবারে পনির ও মাংসের সাথে দারুণ জমে।
সোনেনব্লুমেনব্রোট (Sonnenblumenbrot - সূর্যমুখী বীজের রুটি): নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এই রুটির ওপরে থাকে সূর্যমুখী বীজের আস্তরণ, যা একে এক হালকা মিষ্টি স্বাদ দেয়। ক্রিম চিজ আর ফলের জ্যাম দিয়ে মেখে দেখুন—স্বাদ মুখে লেগে থাকবে!
ড্রাইকর্নব্রোট/ফুয়েনফকর্নব্রোট (Dreikornbrot/Fünfkornbrot - তিন/পাঁচ শস্যের রুটি): গম, রাই, বার্লি, ওটস এবং ভুট্টার মিশ্রণে তৈরি এই রুটিগুলো সম্ভবত জার্মানির সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর বিকল্প। স্যুপের সাথে এর জুড়ি মেলা ভার।
ব্রেজেল (Brezel - প্রেটজেল): নোনতা স্বাদের এই বিশেষ রুটিটি জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্য। মিউনিখের বিয়ার গার্ডেনে বাভারিয়ান বিয়ারের সাথে মাখন মাখানো একটি ব্রেটজেল—এর চেয়ে ভালো জলখাবার আর কী হতে পারে!
তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, জার্মানির খাদ্য সংস্কৃতি কেবল সসেজ আর বাঁধাকপির তরকারিতে আটকে নেই। এর প্রাণশক্তি আজও আসে প্রতিদিনের রুটি থেকে। আর সারা বিশ্বেই জার্মান বেকারি ছড়িয়ে আছে: ভারতের গোয়া, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন, নিউ ইয়র্ক এবং আরও বহু জায়গায়।
এক টুকরো জার্মান ব্রেডের ওপর সুন্দর করে জার্মান পনির আর মাখন মাখিয়ে খেলে হয়তো আপনিও একবাক্যে স্বীকার করবেন—জার্মান রুটিই বিশ্বের সেরা।
