ফার্স্ট লেডির প্রচলিত ধারায় না হেঁটে, মামদানির প্রচারণায় ইচ্ছে করেই আড়ালে থাকেন স্ত্রী রামা দুয়াজি
রামা দুয়াজি, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটির ডেমোক্র্যাটিক মেয়র প্রার্থী জোহরান মামদানির স্ত্রী। তিনি প্রচলিত ফার্স্ট লেডি ভূমিকায় না যেয়ে ভিন্ন পথেই হাঁটছেন।
এই বছরের শুরুতে মামদানির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া দুয়াজি, তার স্বামীর প্রচারণায় সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না। তিনি কোনো টেলিভিশন শোতে একসঙ্গে উপস্থিত হননি, কোনো বড় ম্যাগাজিনে সাক্ষাৎকার দেননি এবং তার ইনস্টাগ্রাম পেজেও স্বামীর প্রচারণার বিষয়ে খুব বেশি পোস্ট করেননি।
দুয়াজির ইনস্টাগ্রাম মূলত মধ্যপ্রাচ্যের নারী ও ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা চিত্রিত করা ও তার শিল্পকর্ম প্রচারে ব্যবহৃত হয়। তবে, জুনের ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিক নির্বাচনের দিনে একটি পোস্ট ছিল, যেখানে দম্পতিকে একসঙ্গে দেখা যায় এবং তিনি ক্যাপশনে লেখেন, 'এর চেয়ে বেশি গর্বিত হওয়া সম্ভব নয়।'
যদি মামদানি মঙ্গলবারের নির্বাচনে জয়ী হন, তবে তিনি হবেন শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র এবং এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র। দুয়াজিও ইতিহাস গড়ার সুযোগ পাবেন; ২৮ বছর বয়সী এই শিল্পী জেন জিদের প্রথম সদস্য হিসেবে নিউ ইয়র্ক সিটির ফার্স্ট লেডি হবেন এবং গ্রেসি ম্যানশনে প্রবেশ করবেন, যেখানে আমেরিকার বৃহত্তম শহরের নজর তার উপরই থাকবে।
যদিও দুয়াজি প্রচলিত প্রচারণার অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন না, তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে উপস্থিত ছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রচারণার উপকরণ নির্মাণে নেপথ্যে থেকে পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি প্রাইমারিতে মামদানির সঙ্গে ভোট দিয়েছিলেন এবং তার বিজয় বক্তৃতার রাতে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি মামদানির সর্বশেষ কমেডি সেন্ট্রালের 'দ্য ডেইলি শো'-তে উপস্থিতিতে সঙ্গে ছিলেন এবং কুইন্সের ফোরেস্ট হিলস স্টেডিয়ামে ১০ হাজারের বেশি মানুষের ভিড়ে বসেছিলেন, যেখানে মামদানি তার সমাপনী বক্তব্য দিয়েছিলেন।
মামদানি মেয়র নির্বাচিত হলে দুয়াজি কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করবেন কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। তিনি সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার সময় সিএনএন-এর অনুরোধ স্বত্বেও সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
যা করতে চান সে বিষয়ে তিনি সচেতন
সিরীয় বংশোদ্ভূত রামা দুয়াজি হিউস্টনে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৯ বছর বয়স পর্যন্ত টেক্সাসে বসবাস করেন, এরপর তার পরিবার দুবাই চলে যায়। তিনি ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি স্কুল অব দ্য আর্টস, স্বল্প সময়ের জন্য কাতারে এবং পরে রিচমন্ড ক্যাম্পাসে ট্রান্সফার হয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি নিউ ইয়র্কের স্কুল অব ভিজ্যুয়াল আর্টসে ভিজ্যুয়াল এসে হিসেবে ইলাস্ট্রেশন-এ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার ইলাস্ট্রেশনগুলো দ্য কাট, বিবিসি, ভোগ এবং দ্য নিউ ইয়র্কার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
২০২১ সালে ডেটিং অ্যাপ হিঞ্জে দুয়াজি এবং মামদানির পরিচয় হয়। তখন মামদানি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে সদ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা সম্পর্কে দুয়াজি তেমন কিছু জানতেন না।
তাদের প্রথম ডেটটি ব্রুকলিনের ইয়েমেনি কফি শপ কাহওয়া হাউসে হয়েছিল, এরপর নিকটস্থ ম্যাকারেন পার্কে একসঙ্গে হেঁটেছিলেন তারা। দ্বিতীয় ডেটে মামদানি দুয়াজিকে কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়ায় তার নির্বাচনী এলাকায় পরিচিত করান।
কয়েক বছর পর, অক্টোবর ২০২৪ সালে মামদানি এবং দুয়াজি বাগদানের সিদ্ধান্ত নেন। ইনস্টাগ্রামে বাগদানের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিন পর মামদানি মেয়র পদে তার প্রচারণা শুরু করেন। তারা ডিসেম্বরে দুবাইয়ে বাগদানের অনুষ্ঠান করেন, এরপর এই ফেব্রুয়ারিতে লোয়ার ম্যানহাটনের সিটি ক্লার্ক অফিসে কোর্টহাউস বিয়ে করেন।
বিয়ের কয়েক মাস আগে, মামদানি এবং দুয়াজি আলোচনা করেছিলেন কিভাবে তার মেয়র পদপ্রার্থিতা তাদের জীবন পরিবর্তন করতে পারে যেমন: ব্যক্তিগত জীবন সীমিত করতে পারেন এবং সম্ভবত দুয়াজিকে জনসাধারণের নজরে তুলে আনতে পারেন।
মামদানি যখন মেয়র পদপ্রার্থিতা ঘোষণা করেন এবং দম্পতিকে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, তখন নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি শিরোনাম ছিল—'সোশালিস্ট এনওয়াইসি মেয়র প্রার্থী জোহরান মামদানি গোপনে দুবাইয়ে বিয়ে সম্পন্ন করেছেন, ছবি প্রকাশ।'
এরপর তিনি তাদের সিভিল সেরিমোনির ছবি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করেন। মামদানি লিখেছেন, 'রামা শুধু আমার স্ত্রী নন, তিনি একজন অসাধারণ শিল্পী, যিনি তার নিজস্ব মেধায় পরিচিত হওয়ার যোগ্য।'
দম্পতির পরিচিত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, দুয়াজি জানতেন তিনি কীসের মধ্যে প্রবেশ করছেন। মামদানি মেয়র পদে প্রচারণা চালাচ্ছেন এমন বছরে, তিনি তার প্রধান সমর্থন হিসেবে কাজ করেছেন। দুয়াজি মামদানিকে প্রচারণার ব্র্যান্ড পরিচয় চূড়ান্ত করতে সাহায্য করেছেন এবং প্রচারণার আইকনোগ্রাফি ও ফন্টের চূড়ান্ত সংস্করণে কাজ করেছেন।
এতে নিউ ইয়র্কারদের জন্য সহজেই চিহ্নিতযোগ্য বিশেষ রঙের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে: মেট্রোকার্ড কমলা-হলুদ, নিউ ইয়র্ক মেটস নীল, এবং ফায়ারহাউস লাল।
ফন্টটি গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে ব্যবহৃত গাঢ়-হলুদ বোডেগা সাইনবোর্ডের সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।মামদানি প্রচারণার ডিজিটাল মাধ্যমগুলো উন্নত করার কৃতিত্ব দিয়েছেন দুয়াজিকে।
মাঝেমধ্যেই তার অল্প বয়সে বিয়ে এবং দম্পতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে মামদানি নিউ ইয়র্কের নবজাতক এবং তাদের পরিবারের জন্য 'বেবি বাস্কেট' প্রদানের প্রস্তাব করেছিলেন। এসময় তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি শীঘ্রই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন কিনা।
৩৪ বছর বয়সী মামদানি হাসি দিয়ে উত্তর দেন, 'আমার মনে হচ্ছে আমি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলছি,' এবং যোগ করেন যে আপাতত তার সম্পূর্ণ মনোযোগ মেয়র নির্বাচনে রয়েছে।
ফিলিস্তিনি বিষয়ে দুয়াজির মনোযোগ
প্রচলিতভাবে, উচ্চ-প্রোফাইল সমর্থনমূলক ভূমিকায় থাকা ফার্স্ট স্পাউসরা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন, এমন কিছু উদ্যোগকে সমর্থন দেন যা তাদের সঙ্গীর এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাদের আরও বিতর্কিত মতামতগুলো গোপন রাখেন।
দুওয়াজির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে জোরেশোরেই প্রকাশ পেয়েছে। তার শিল্পকর্মে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের নারী, গাজার তীব্র ক্ষুধা এবং ফিলিস্তিনি পতাকার সাদা-কালো চিত্র তুলে ধরেছেন।
এই পোস্টগুলো মূলত তার স্বামীর ইসরায়েলি সরকারের সমালোচনা এবং হামাসের ৭ অক্টোবর, ২০২৩ সালের হামলার পর যুদ্ধ পরিচালনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এমন মন্তব্য যা মাঝে মাঝে নিউ ইয়র্ক সিটির ইহুদি জনগোষ্ঠীকে, যা ইসরায়েলের বাইরে বৃহত্তম, উত্তেজিত করেছে।
কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক লিসা বার্নস, যিনি ফার্স্ট লেডির ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন, বলেন, "তিনি যা পোস্ট করছেন তা অনেকাংশে মামদানি যা বলছেন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের কাজ কিছুটা একত্রিত হতে শুরু করেছে, যেখানে তিনি যে অ্যাডভোকেসি করছেন যা তার কাজকে সমর্থন করবে — যদিও এটি আলাদা — বরং তা ক্ষতি করবে না।"
এপ্রিলে আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শিল্পকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন ইয়াং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে, দুয়াজি বলেন, তিনি তার কাজ তৈরি করেন 'সেসব মানুষের জন্য যারা আমার যত্ন নেওয়া বিষয়গুলোর প্রতি যত্নশীল।'
তিনি আরও বলেন, 'ভয়ের কারণে এত মানুষ বাদ পড়ে যায় এবং নীরব হয়ে যায়. তাই আমি যা করতে পারি তা হলো আমার কণ্ঠ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিস্তিন এবং সিরিয়ায় যা ঘটছে তা নিয়ে যতটা সম্ভব কথা বলা।'
একটি সংজ্ঞায়িত ভূমিকা
নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদপ্রার্থীদের নিজস্ব পাবলিক প্রোফাইল থাকা স্বামী-স্ত্রীর কাছে অপরিচিত কিছু নয়।
মেয়র বিল ডি ব্লাসিওর তখনকার স্ত্রী, চিরলেইন ম্যাক্রে, তার প্রচারণা এবং প্রশাসনের একটি প্রধান অংশ ছিলেন। তিনি কর্মী নির্বাচনে এবং উচ্চ-প্রোফাইল নিয়োগে পরামর্শ প্রদান করেছিলেন। ডি ব্লাসিওর ভোটারদের কাছে আকর্ষণের একটি অংশ ছিল তার বহুজাতীয় পরিবার যা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
২০১৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রোফাইল ম্যাক্রে এবং ডি ব্লাসিওকে 'বিল ও হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটনের মতোই একটি প্যাকেজ ডিল' হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
ডায়ানা টেলর, সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গের দীর্ঘদিনের সঙ্গী, একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং ফাইনান্স এক্সিকিউটিভ ছিলেন, যিনি নিজেকে শুধুমাত্র এই ভূমিকার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেননি।
২০২০ সালে ব্লুমবার্গ যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন, তখন টেলরের বন্ধু এবং তৎকালীন ভোগ ম্যাগাজিনের সম্পাদক আনা উইন্টুর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিলেন, 'তার বিখ্যাত প্রেমিককের কাছে তিনি সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় বিষয়। তিনি বুদ্ধিমান, স্বাধীন — এবং পুরোপুরি নিজস্ব একজন মানুষ।'
আপাতত, দুয়াজির উপস্থিতি বেশিরভাগ নিউ ইয়র্কবাসীর চোখে ধরা পড়ছে না, যদিও তার উপস্থিতি নিঃশব্দে তার স্বামীর প্রচারণায় অনুভূত হয়।
সম্প্রতি ব্রুকলিনের একটি সিনিয়র সিটিজেন সেন্টারে ভোটে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আয়োজিত 'সিপ অ্যান্ড পোর' অনুষ্ঠানে, মামদানি একটি আর্ট ইনস্ট্রাক্টরের দেখানো অনুযায়ী শরতের দৃশ্য আঁকার চেষ্টা করছিলেন।
হাতে ব্রাশ এবং রঙের জন্য ডটযুক্ত একটি কাগজের প্লেট নিয়ে, মামদানি মানুষের প্রত্যাশা কমানোর চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি বলেন, "আমি আপনাদের সতর্ক করে দিতে চাই, আমি খুব ভালো ছবি আঁকতে পারি না। শেষবার তিনি কিছু এঁকেছিলেন তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ডেটে। মামদানি তখন অঙ্কন শুরু করলেন। পরে তার স্কেচের মান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি হাসিমুখে বলেন, 'আমার স্ত্রীকে বলবেন না।'
মানা স্বত্বেও তার একজন প্রচারণা সহকারী ইতোমধ্যেই তার আঁকা গাছের ছবিটি তার স্ত্রীকে পাঠিয়েছিলেন।
দুয়াজি সেই ছবি দেখে মজা পেয়ে বলেন, 'এটি তো একটি ত্রিভুজ।'
