জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর পুতিনের যুদ্ধ বন্ধের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ট্রাম্প
পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ফাঁকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ থামানোর ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর বিবিসির।
রোম ছাড়ার পর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, পুতিন হয়তো তাকে 'ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে সময়ক্ষেপণ' করছেন। কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন বেসামরিক এলাকায় রাশিয়ার সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তিনি এমন মন্তব্য করেন। ট্রাম্প লিখেছেন, 'পুতিনের এখন বেসামরিক এলাকাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কোনো যুক্তি নেই।'
এর আগে, ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স বাসিলিকায় পোপের শেষকৃত্যানুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ আগে ট্রাম্প ও জেলেনস্কিকে গভীর আলোচনায় লিপ্ত দেখা যায়।
হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে ১৫ মিনিটের এই বৈঠককে 'খুবই ফলপ্রসূ' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
বৈঠকের পর ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেছেন জেলেনস্কি। সেখানে তিনি লিখেছেন, 'বৈঠকটি খুবই "অর্থবহ" এবং যদি তারা যৌথভাবে সফল হন, তাহলে এটি ঐতিহাসিক হয়ে উঠতে পারে।'
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওভাল অফিসে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পর এটাই ছিল ট্রাম্প ও জেলেনস্কির প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।
ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার হামলা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে 'পুতিন হয়তো আসলে যুদ্ধ বন্ধ করতে চান না' এবং তাকে হয়তো 'ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা' বা 'দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার' মাধ্যমে আলাদাভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তার দূত স্টিভ উইটকফের রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিন ঘণ্টার বৈঠকের পর রাশিয়া ও ইউক্রেন শান্তিচুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ক্রেমলিনও জানিয়েছিল, পুতিন সরাসরি, পূর্বশর্তহীন আলোচনায় বসার জন্য প্রস্তুত আছেন।
রোমে শনিবারের বৈঠকে ট্রাম্প আবারও জেলেনস্কিকে মনে করিয়ে দেন, তার হাতে আর কোনো উপায় নেই। ওভাল অফিসের সেই আলোচনায়ও ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ জিতছে না। বরং তিনি প্রায়ই ইউক্রেনকেই যুদ্ধের জন্য দায়ী করে থাকেন এবং জেলেনস্কিকে শান্তি আলোচনায় বাধা বলেও উল্লেখ করেছেন।
তবে হোয়াইট হাউজ এবার ভিন্ন সুরে বলেছে, শনিবারের বৈঠক ছিল ইতিবাচক। আর জেলেনস্কি এটিকে 'অত্যন্ত প্রতীকী ও সম্ভাবনাময়' বলে মন্তব্য করেছেন। দুই নেতার বৈঠকের দুটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখা যায় ট্রাম্প নীল স্যুটে ও জেলেনস্কি কালো পোশাকে মুখোমুখি বসে তীব্র আলোচনা করছেন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা 'একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত' উল্লেখ করে ছবিটি শেয়ার করেছেন, লিখেছেন: 'শান্তির জন্য দুই নেতা একত্রিত হয়েছেন, এটি বলার জন্য কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই।'
আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি দাঁড়িয়ে আছেন। ইঙ্গিত মিলেছে, এই দুই নেতা তাদের বৈঠকে সহায়তা করেছেন।
বৈঠক শেষে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি একসঙ্গে সেন্ট পিটার্স বাসিলিকার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন। সেখানে উপস্থিত জনতা জেলেনস্কিকে করতালি দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। পরে তারা সামনের সারিতে বসেন। পুরো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালে তাদের মাঝে অন্য রাষ্ট্রপ্রধানরা বসেছিলেন।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা দ্বিতীয় একটি বৈঠকের ইঙ্গিত দিলেও, ট্রাম্প বৈঠক শেষে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান এবং তার প্লেন রোম ত্যাগ করে।
অন্যদিকে জেলেনস্কি রোমে থেকেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁর সঙ্গে ভিলা বোনাপার্তে এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের সঙ্গে ভিলা ওলকনস্কিতে পৃথক বৈঠক করেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েনের সঙ্গেও তিনি দেখা করেন।
মাখোঁ পরে এক পোস্টে বলেন, 'ইউক্রেনে যুদ্ধের অবসান আমাদের ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি অভিন্ন লক্ষ্য।' তিনি আরও যোগ করেন, ইউক্রেন একটি 'শর্তহীন যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তুত।'
ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, স্টারমার ও জেলেনস্কি 'ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই শান্তি' নিশ্চিত করতে সাম্প্রতিক ইতিবাচক অগ্রগতির বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে এক উত্তপ্ত বৈঠকে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে না নিয়ে 'তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি' বাড়াচ্ছেন।
এর আগেও ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর চাপ দিয়েছিলেন, যাতে তারা যুদ্ধ থামানোর শর্ত হিসেবে কিছু ভূখণ্ড, বিশেষ করে ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ, ছেড়ে দেয়।
তবে জেলেনস্কি বারবার এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'একটি পূর্ণাঙ্গ ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতি হলে তবেই সব বিষয় নিয়ে আলোচনা সম্ভব।'
