কাঠপট্টি: যেভাবে নীরব হয়ে গেল ধলেশ্বরীর ব্যস্ততম লঞ্চঘাট
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ইছামতী আর মেঘনা—এই চার নদী ঘিরে রেখেছে কাঠপট্টি লঞ্চঘাটটির তিন দিক। নদীগুলো ধলেশ্বরীর সঙ্গে উত্তর, পূর্ব আর পশ্চিমে সংযুক্ত। এককালে এসব রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর অধিকাংশ এখানে যাত্রাবিরতি নিত। যাত্রী চলাচলের পাশাপাশি মালামাল ওঠানামায়ও ঘাটটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
ধলেশ্বরীর ব্যস্ততম এই ঘাটটি বিশ বছর আগেও ছিল মুন্সিগঞ্জ জেলার পঞ্চসার ইউনিয়নে। বর্তমানে কিছুটা পশ্চিমে সরিয়ে আনায় এটি মিরকাদিম পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ঘাটের দক্ষিণে পদ্মা নদী থাকলেও তা টঙ্গিবাড়ী থানার শেষ প্রান্তে হওয়ায় বেশ দূরেই বলা চলে।
কাঠপট্টি ঘাটে এখন চাঁদপুরগামী একমাত্র যে লঞ্চটি ভেড়ে, তার নাম 'গ্রিন ওয়াটার'। এর চালক শাহ আলম। তিনি কুশিয়ারা, সুরমা, বলেশ্বর, গোমতী ও যমুনায় লঞ্চ বা কার্গো চালিয়েছেন। পশুর নদী হয়ে ভারতের হলদিয়া বন্দর থেকে সিমেন্ট কোম্পানির জন্য ফ্লাই অ্যাশ নিয়ে এসেছেন। দীর্ঘ ৪০ বছরে নদী ধরে চলাচল করলেও ধলেশ্বরীর মতো 'মিঠা পানির' নদী তিনি খুব কমই দেখেছেন। ঝকঝকে, ঝলমলে পানি ছিল ধলেশ্বরীর। সেই পানি তারা গোসল ও রান্নার কাজে ব্যবহার করতেন। এই ঘাটে তিনি বহুবার শত শত বস্তা মুগ ডাল, মসুর ডাল এবং পশুখাদ্য খৈল ও ভুসি নিয়ে ট্রলার ভিড়িয়েছেন। আগের সেই জমজমাট কাঠপট্টি ঘাট তার চোখে ভাসে; বর্তমানের মৃতপ্রায় অবস্থা তাকে কষ্ট দেয়।
কাঠপট্টির বয়স
ঘাটের প্রবেশ ফি আদায় করেন আব্দুল কাদির। আশি বছর বয়স তার। তিনি বললেন, 'এ ঘাটের বয়স পঁয়ষট্টি বছরের কম হবে না। তবে এই নৌপথের গুরুত্ব অনেক পুরনো। গুণটানা ঘাসিনৌকায় করে দক্ষিণবঙ্গ থেকে এ পথে মালামাল পরিবহন করা হতো। তারপর উনিশ শতকের শেষার্ধে স্টিমারও চলাচল করত। পথটির অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণ হলো এর চারপাশের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো। এর মধ্যে কাঠপট্টি সংলগ্ন কমলাঘাটের বয়স প্রায় দেড় শ বছর। ফিরিঙ্গিবাজার, রিকাবীবাজার, বেতকা, মালখানগর, বালিগাঁও ও তালতলাও বেশ প্রাচীন। তবে নদীপথ নাব্যতা হারানোয় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো এখন ধুঁকছে।'
পাকিস্তান আমলে কাঠবডি লঞ্চের যাত্রা শুরু হয়। সেই হিসাব করেই আব্দুল কাদির ঘাটের বয়স পঁয়ষট্টি বছর নির্ধারণ করেছেন। শুরুতে কাঠপট্টি ঘাটে কোনো জেটি ছিল না। লঞ্চ থেকে কাঠের সিঁড়ি নামিয়ে দেওয়া হতো, আর যাত্রীরা ওপর থেকে ধরে রাখা বাঁশে ভর দিয়ে লঞ্চে উঠতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই নৌপথের ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়। দক্ষিণবঙ্গে নতুন নতুন রুট চালু হওয়ায় লঞ্চের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। একসময় কাঠবডি লঞ্চের পাশাপাশি স্টিল বডির দোতলা ও তিনতলা লঞ্চের দেখা মেলে। দক্ষিণবঙ্গের লঞ্চ যত বাড়ে, কমলাঘাটের বাণিজ্যও তত প্রসারিত হয়। ভোলা, বরিশাল, কালাইয়া, লালমোহন, হাতিয়া, রাঙ্গাবালী ও পাতারহাটের লঞ্চগুলো ধান, মুগ, মসুর ও খেসারি নিয়ে কাঠপট্টিতে আসত। পরে এসব পণ্য রিকাবীবাজারের ধানের চাতাল ও কমলাঘাটের আড়তগুলোতে সরবরাহ করা হতো।
প্রতিদিন হাজার হাজার বস্তা পণ্য
ঘাট শ্রমিকদের নেতা মুক্তার হোসেন সরদার জানান, রিকাবীবাজারে একসময় দুই শতাধিক ধানের মিল ছিল। তখন দিনে ৪-৫ হাজার বস্তা ধান এবং ৩-৪ হাজার বস্তা ডাল নামানো হতো। দক্ষিণবঙ্গে আলু যেত প্রতিদিন ২ থেকে আড়াই হাজার বস্তা। একেকটি বস্তায় ৮০-৯০ কেজি পণ্য থাকত। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের আনাগোনা ছিল এই কাঠপট্টি ঘাটে। ঘাটের ধারেই ছিল আলুর শেড ও ভরত পালের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান। তবে জৌলুস হারানোর সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টির দোকানগুলোও উঠে গেছে। বর্তমানে টিকে আছে কেবল কাঠের আড়তগুলো, যেখান থেকে জায়গাটির নাম হয়েছে 'কাঠপট্টি'। ধানের মিলগুলোতে মূলত রংপুরের শ্রমিকেরা কাজ করতেন। কমলাঘাটে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের হাজার হাজার শ্রমিকের পাশাপাশি অবাঙালি শ্রমিকও ছিল।
প্রবীণ শ্রমিক ইয়াসিন মিয়া স্মৃতিচারণা করে বলেন, জুবলু, নূর আলী ও আবুল কালামসহ চারজন ঘাট সরদার ছিলেন। তাদের অধীনে কাজ করতেন দেড় শ শ্রমিক। কালু মিয়া ছিলেন ঘাট সুপারভাইজার। সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঢাকা সদরঘাট থেকে দক্ষিণবঙ্গগামী লঞ্চগুলো একের পর এক এসে ভিড়ত। আবার রাত ২টা থেকে দক্ষিণবঙ্গ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী লঞ্চগুলোর ভিড় শুরু হতো। মালামাল ওঠানামার এত চাপ ছিল যে শ্রমিকদের নিশ্বাস ফেলার সময় থাকত না। ইয়াসিন মিয়ার মতে, আগের ব্যস্ততা থাকলে সরকার এই ঘাট থেকে বছরে কোটি টাকা রাজস্ব পেতে পারত।
একসঙ্গে সাতটি লঞ্চ
কাঠপট্টিতে একসময় ভিড়ত লালমোহনের শ্রীনগর; রাঙ্গাবালীর জামাল ও জাহিদ; হাতিয়ার তাসরিফ ও টিপু; ভোলার ময়ূরপঙ্খী, সাগরকন্যা, সান্দ্রা ও লালী; দৌলতখাঁ রুটের কর্ণফুলী; কালাইয়ার ধুলিয়া ও বন্ধনসহ চাঁদপুরগামী প্রায় সব লঞ্চ। ঘাটে পন্টুন ছিল তিনটি। একসঙ্গে সাতটি লঞ্চ ভিড়তে পারত।
তালতলা-ঢাকা, ডহরি-ঢাকা, সিরাজদিখান-নারায়ণগঞ্জ রুটের ১৮টি কোম্পানির ৩৬টি লঞ্চ এ পথে যাতায়াত করত। ইছামতী নদীপথের এই সব কটি লঞ্চ কাঠপট্টিতে যাত্রাবিরতি দিত। এগুলোর মধ্যে প্রিন্স অব মধ্যপাড়া, কুইন অব মধ্যপাড়া, তাইজদ্দিন, মিলন, সম্রাট, বাহরাইন ও সোনার বাংলার কথা এখনো মনে করতে পারেন শ্রমিক ইয়াসিন মিয়া।
তৎকালীন লঞ্চগুলো ছিল প্রায় ৫০ ফুট দীর্ঘ ও ২৫ ফুট চওড়া। নিচের ডেক কাঠের বেঞ্চিতে সাজানো থাকলেও ওপরের তলার আসনে গদি লাগানো থাকত। ওপরের কেবিনের প্রবেশমুখে লেখা থাকত— 'বিলাসে ভাড়া দেড় গুণ'।
স্মৃতিতে হকার ও দোতরার সুর
ষাাট বছর বয়সী আক্তার হোসেন আগে লঞ্চে ঝালমুড়ি আর নারকেলি ফেরি করতেন। তিনি বলেন, 'তখন তালতলা থেকে ঢাকা যেতে তিন ঘণ্টা লাগত। যাত্রীরা আয়েশ করে বসতেন। রেলিং ধরে দাঁড়ালে নদীর বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যেত। লঞ্চের ঝালমুড়ি ছিল যাত্রীদের খুব প্রিয়। আমরা দুই-আড়াই কেজি মুড়ি নিয়ে উঠতাম। সরষের তেল, পেঁয়াজ ও মরিচ কুচি দিয়ে ঝালমুড়ি মাখিয়ে বিক্রি করতাম। দুই টাকার মুড়ি দুজন মিলে খাওয়া যেত। নারকেলিও পছন্দের ছিল অনেক যাত্রীর। এ ছাড়া সুই, সুতা, চিরুনি আর নায়িকার ছবি লাগানো হাত আয়না বিক্রি করত ফেরিওয়ালারা।' তিনি আরও জানান, মাঝে মাঝে অন্ধ ফকিরেরা দোতরা হাতে লঞ্চে উঠে সুমিষ্ট সুরে গান গেয়ে টাকা তুলতেন। সব মিলিয়ে লঞ্চ ভ্রমণ ছিল আনন্দঘন।
ইছামতী শুকিয়ে এখন সরু ফিতা
শ্রমিক ইয়াসিন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, একসময় ধলেশ্বরীর পানি খাওয়া যেত, আর এখন হাত ধুতেও ইচ্ছে করে না। নদীর পশ্চিম পাড়ে শতাধিক ইটভাটা আর পূর্ব পাড়ে ডাইং, ম্যাচ ও সিমেন্ট কারখানা। কারখানার বর্জ্য আর কয়লার প্রভাবে পানি এখন বিষাক্ত। একসময় এ নদীতে তীব্র স্রোত ছিল; মেঘনা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসত। লোনা পানির ফেউয়া ও তুলাডান্ডি মাছের পাশাপাশি বোয়াল, চেউয়া, বাইলা, তপস্বী ও চিংড়ি ছিল প্রচুর। এখন নদীতে স্রোত নেই, মাছও দুষ্প্রাপ্য। কার্তিক থেকে চৈত্র—এই ছয় মাস কাঠপট্টিতে পানির গভীরতা থাকে মাত্র ৮-১০ ফুট। ধলেশ্বরীর শাখা নদী ইছামতী শুকিয়ে এখন সরু ফিতার মতো। নদীর সঙ্গে সঙ্গে মরে গেছে আব্দুল্লাহপুর, বেতকা, তালতলা, সিরাজদিখান, বালিগাঁও, ডহরি আর বক্তাবলি ঘাটও।
তালতলা-ঢাকা ও ডহরি-ঢাকা রুটের লঞ্চ বন্ধ হয়েছে প্রায় ২০-২২ বছর আগে। পদ্মা থেকে আসা বালি ও পলি নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পর এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ড্রেজিং করেও সামাল দেওয়া গেল না। বালি আর পলিতে ভরাট হতে থাকল ঘাটের প্রবেশমুখ। ভরাট হতে হতে বর্তমানে ঘাটটি প্রায় মৃত। এর ফলে প্রায় দুই শ শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। কেবল নাব্যতা সংকট নয়, সড়কপথের উন্নয়নও নৌপথের যাত্রী কমিয়ে দিয়েছে।
ফেরিওয়ালা আক্তার হোসেনের ভাষায়, 'মানুষ এখন অনেক ব্যস্ত। নদীতে বাতাস খাওয়ার সময় তাদের নেই। ঢাকায় চাকরি, ব্যবসা করেন বেশিরভাগ মানুষ। তাদের সময়ের দাম আছে। তারা দ্রুত কর্মস্থলে পৌছাতে চান। সড়কপথ সে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। লঞ্চ তাই চলে না, নদী মরে গেলেও কেউ কাঁদে না।'
তবুও আশার আলো
চাঁদপুরগামী 'গ্রিন ওয়াটার' ছাড়া বর্তমানে কাঠপট্টি-ঢাকা রুটে মাত্র দুটি লঞ্চ দিনে দুবার করে যাতায়াত করে। মাঝেমধ্যে কিছু মালবাহী ট্রলার ভিড়ে ঘাটে। তবে ৮০ বছর বয়সী আব্দুল কাদির এখনো আশা ছাড়েননি। তিনি মনে করেন, সরকার যদি ঘাটটি আধা কিলোমিটার উত্তরে সরিয়ে নেয়, তবে দক্ষিণ বঙ্গগামী বেশ কিছু লঞ্চ পাখায় পানি পাবে। আগের মতো না হলেও অনেকটা জমে উঠবে ঘাট। কালের অতলে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে কাঠপট্টি।