বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি: পানি থেকে কয়লা তুলে টিকে আছেন যে নারীরা
এখানে এলে অন্য সব কিছুর আগে আপনার নাকে এসে বাড়ি খাবে একটি ঘন এবং ধাতব ও এর সঙ্গে মিশে থাকা বর্জ্যের গন্ধ। প্রায় দুই দশক ধরে শিল্পকারখানার বর্জ্য বহন করে আসা পানির দুর্গন্ধ এটি। এ পানির উৎস হলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নিষ্কাশন নালা। এটি কখনোই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো মানচিত্রে স্থান পায়নি।
কোনো শ্রম নিবন্ধন বই, কোনো পেশাগত স্বাস্থ্য প্রতিবেদন এবং এই অঞ্চলের শ্রমশক্তির ওপর করা কোনো সরকারি জরিপেও এই নালার উপস্থিত নেই। তবুও, সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিন ৩০ জনেরও বেশি নারী নালাটির হাঁটু সমান পানিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের হাতগুলো কালো পানির নিচে কাজ করে চলে। তারা পলি থেকে কয়লার কাদা টেনে বের করে আনেন।
৫৮ বছর বয়সী মোর্শেদা বেগম এই নালায় কাজ করছেন যখন তার ছোট সন্তান কেবল হাটকে শিখেছিল। তার সেই সন্তানের এখন নিজের ছেলেমেয়ে রয়েছে। মোর্শেদার হাতের গিঁটগুলো শক্ত ও স্থায়ীভাবে ধূসর হয়ে গেছে। তিনি এমন অভ্যস্ততায় পানির মধ্যে হাত চালান, যেন বহু আগেই এই কাজের প্রতিটি নড়াচড়া নিয়ে ভাবা বন্ধ করে দিয়েছেন।
তার হাত দুটো পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করছে, ছাকছে এবং জমা করছে; সংগ্রহ করছে, ছাকছে, জমা করছে।
তিনি ওপরের দিকে না তাকিয়েই বলতে থাকেন, "মানুষ মনে করে এটি লজ্জাজনক কাজ। তাদের তা ভাবতে দিন। আমি কখনই কোনো প্রতিবেশীর কাছ থেকে টাকা ধার করিনি। আমি কখনই আমার নাতি-নাতনিদের ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে পাঠাইনি। যারা আমার কাজ নিয়ে লজ্জা বোধ করেন, তারা কি একই কথা বলতে পারবেন?"
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান— বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জ্বালানি প্রকল্প, যা দেশের একমাত্র সচল ভূগর্ভস্থ খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক যেকোনো মানদণ্ডে এটি উন্নয়নের একটি সফল গল্প। কিন্তু এর আশপাশের গ্রামগুলো ভিন্ন এক গল্প বলে।
প্রতিদিন সকালে নারীরা সকাল আটটার আগেই এখানে চলে আসেন। তারা দলবদ্ধ হয়ে আসেন। মোট আটটি দল রয়েছে, প্রতিটি দলে ২৫ থেকে ৩০ জন সদস্য। পালাক্রমের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। প্রতিটি দল সপ্তাহে মাত্র একদিন কাজ করে। সেই দিনে তারা ১২ ঘণ্টা কাজ করেন। কোনো চুক্তি নেই, কোনো তদারককারী নেই, কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জামও নেই। আছে শুধু নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া—কে কখন কাজ করবে। আর আছে এক নীরব উপলব্ধি যে এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না, কারণ এখানে ভেঙে পড়া মানেই ক্ষুধা।
৪৭ বছর বয়সী রাশিদা খাতুন তার দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ সদস্যদের একজন। এক দশক আগে তার স্বামী পিঠে আঘাত পাওয়ার পর দিনমজুরের কাজ হারান। এরপরই তিনি এই কাজে আসেন। তিনি সেই প্রথম দিকের সময়ের কথা এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন, যেন জীবনের একটি সংকট পার করে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, "আমি প্রথমে এই কাজের বিষয়ে কিছুই জানতাম না। অন্য এক নারী আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। আমি দেখেছিলাম তারা কীভাবে এটি করে, এবং তারপর আমি নিজেই এটি করেছিলাম। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, আমি কিছু প্রবীণ বা বয়স্কদের চেয়েও দ্রুত কাজ করতে পারছিলাম।"
এ কথা বলেই তিনি হেসে ওঠেন—এমন এক হাসি, যা এই পরিবেশের সঙ্গে যেন পুরোপুরি মানানসই নয়। তিনি বলেন, 'যখন আর কোনো বিকল্প থাকে না, তখন খুব দ্রুতই শিখে ফেলতে হয়।'
তারা যা সংগ্রহ করছেন তা হলো কয়লার স্লিজ বা কাদা। এগুলো হলো কয়লার সূক্ষ্ম কণা, যা খনির প্রক্রিয়াকরণের সময় ধুয়ে বের হয়ে বর্জ্য হিসেবে খালের পানিতে ভেসে আসে। খনির কাছে এর কোনো মূল্য নেই। কিন্তু নারীদের কাছে এটি জীবিকার উৎস। আর এই পুরো কার্যক্রম, যতই অনানুষ্ঠানিক হোক না কেন, এমন নিখুঁতভাবে পরিচালিত হয় যা যেকোনো ব্যবস্থাপককে বিস্মিত করতে পারে।
২৫ থেকে ৩০ সদস্যের প্রতিটি দলে কাজের বিভাজন নির্দিষ্ট এবং স্থায়ী। কিছু নারী খালের ভেতরে নেমে স্রোতের মধ্যে জাল ধরে রাখেন, যাতে ভেসে আসা কয়লার কাদা আটকে যায়। অন্যরা ওপরে দাঁড়িয়ে সেই জালে জমা হওয়া কাদা তুলে আনেন।
কিছু সদস্য সংগৃহীত কয়লার স্তূপ পাহারা দেন। অন্যরা চারপাশে নজর রাখেন, কেউ বাধা দিতে এলে সতর্ক করার জন্য। কেউ নিজের দায়িত্ব পরিবর্তন করেন না। কেউ দলও পরিবর্তন করেন না। এই কাঠামো কঠোর, কারণ এখানে কঠোরতাই ন্যায্যতার একটি রূপ।
১২ ঘণ্টার কর্মদিবস শেষে একটি দল প্রায় ১৪ থেকে ১৫ মণ, অর্থাৎ আনুমানিক ৫৫০ থেকে ৬০০ কেজি কয়লার কাদা সংগ্রহ করতে পারে। সরবরাহকারীরা—যাদের বেশিরভাগই আশপাশের ইটভাটার সঙ্গে যুক্ত—এসে সরাসরি এগুলো কিনে নেন। প্রতি মণের দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
পরে এই কয়লা ইট পোড়ানোর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একটি দলের এক দিনের সংগ্রহের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। মাসজুড়ে আটটি দল পালাক্রমে কাজ করায় এই খাল থেকে উত্তোলিত কয়লার মোট অর্থমূল্য দুই লাখ টাকারও বেশি।
আয়টি সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি সমানভাবে ভাগ করা হয়। কাজের ধরন যাই হোক, প্রত্যেক নারী দিনের শেষে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে পান। অঙ্কটি খুব বড় নয়। কিন্তু সমতার বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। স্থানীয়দের মতে, প্রায় ২০ বছর আগে খনির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার পর এবং বর্জ্যপানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার পর এর সূচনা হয়।
পুরুষরা নয়, নারীরাই এটি সংগঠিত করেছিলেন। তারাই দল গঠন করেন, পালাক্রমের নিয়ম তৈরি করেন এবং আচরণ ও কাজের ক্ষেত্র নিয়ে অলিখিত বিধি স্থির করেন। কেউ তাদের নিয়োগ দেয়নি। কোনো বেসরকারি সংস্থা সহায়তা করেনি। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অর্থায়ন করেনি। প্রয়োজনের তাগিদে এটি ধীরে ধীরে একটি কার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
৫২ বছর বয়সী রীনা আক্তার প্রায় শুরু থেকেই কাজ করছেন। তিনি শুরুর বছরগুলোর কথা মনে করেন। সেসময় দলগুলো ছোট এবং কম সংগঠিত ছিল এবং কাজের দিনগুলো নিয়ে প্রায়ই বিরোধ বা ঝগড়া হতো।
তিনি বলেন, "আমরা নিজেরাই এটি সমাধান করেছিলাম। করতেই হয়েছে। আমাদের হয়ে কেউ কিছু করতে আসেনি। আমরা নিয়ম করেছি। আমরা সেই নিয়ম কার্যকর করেছি। এখন বেশিরভাগ সময় সবকিছু ঠিকঠাক চলে।"
তিনি যা বর্ণনা করছেন — কোনো বিশেষ অহংকার ছাড়াই, কেবল সত্য বা তথ্য হিসেবে — তা হলো একটি স্ব-শাসিত শ্রম ব্যবস্থা। এটি অনানুষ্ঠানিক, অরক্ষিত এবং সম্পূর্ণ নারীচালিত। পুরুষরা কেন নেই—এই প্রশ্ন করলে নারীরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। কারও মতে, এই কাজ পুরুষদের মর্যাদার সঙ্গে যায় না। কারও মতে, পুরুষদের জন্য অন্য ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজের সুযোগ রয়েছে। আবার কেউ বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করার বিষয়টি কোনোভাবে নারীদের কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
কারণ যাই হোক, ফলাফল একটাই। ৪০ থেকে ৬০-এর শেষ ভাগ পর্যন্ত বয়সী নারীদের নিয়ে গঠিত একটি শ্রমশক্তি এমন একটি অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে, যাকে সমাজ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় না।
তবে তাদের সবচেয়ে ক্ষোভ কাজ নিয়ে নয়। বরং ক্ষোভের মূল কারণ ৩০ মিটার দূরে থাকা তালাবদ্ধ গেট বা প্রবেশদ্বার।
খনির ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ঝাড়ু দেওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সহায়তামূলক কাজের জন্য মানুষ নিয়োগ দেওয়া হয়। এগুলো হলো এই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সবচেয়ে কম বেতনের চাকরি — যে চাকরিগুলো, যেকোনো ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতিতে যৌক্তিকভাবে খনির ঠিক চারপাশের বা স্থানীয়দেরই পাওয়া উচিত ছিল। এর পরিবর্তে, নারীরা অভিযোগ করেন, সেই পদগুলো ক্রমাগত বাইরের থেকে আনা কর্মীদের দ্বারা পূরণ করা হয়।
৬১ বছর বয়সী কুলসুম বানু তার সারাজীবন খনির প্রবেশদ্বার থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে বসবাস করে কাটিয়েছেন। এই প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি আমাদের আলাপচারিতায় প্রথমবারের মতো কণ্ঠ উঁচু করেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা এই জিনিসটার পাশেই থাকি। এর বাতাসে শ্বাস নিই। আমাদের পানির স্বাদেও এর ছাপ। আমাদের সন্তানরা এর শব্দ শুনে বড় হয়েছে। তবু তারা আমাদের একটি ঝাড়ুদারের চাকরিও দিতে পারে না? এমন কি একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও না?"
তিনি আরও বলেন, "তারা মেঝে পরিষ্কার করার জন্য বাইরের লোক নিয়ে আসে, আর আমরা বেঁচে থাকার জন্য নর্দমার পানিতে দাঁড়িয়ে থাকি। এটা কেমন ন্যায়বিচার?"
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নন বলে জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, "যদিও আমার কাছে এই মুহূর্তে সঠিক তথ্য বা উপাত্ত নেই, তবে যতদূর আমার মনে পড়ে, খনিতে মোট ২৬০ জন মানুষ কাজ করেন। তাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই স্থানীয় বাসিন্দা। অতএব, আমার মতে, এই দাবিটি সঠিক নয়। তাছাড়া, খনির প্রকৃতপক্ষে যতটুকু প্রয়োজন, আমরা তার চেয়ে বেশি কর্মী নিয়োগ করতে পারি না। সুতরাং, আমাদের পক্ষে সবাইকে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়।"
নারীরা যে পানিতে কাজ করেন তা কেবল নোংরা নয়। এই নিষ্কাশন নালাটি খনির কার্যক্রম থেকে নির্গত শিল্প বর্জ্য বহন করে, যার সাথে অনেকের মতে মানুষের মলমূত্র বা পয়ঃবর্জ্যও যুক্ত থাকে। পানিটি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ। ভূগর্ভস্থ তাপীয় প্রক্রিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এমনটি হয়। নারীরা এত দীর্ঘ সময় ধরে এই পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন যে, এর উপকারিতা ও ক্ষতি নিয়ে তাদের নিজেদের কিছু ধারণাও তৈরি হয়েছে।
৬৪ বছর বয়সী ফেরোজা বেগম তার দলের সবচেয়ে বয়স্ক কর্মীদের একজন। তার চলাফেরায় এমন এক ধরনের ধীরতা আছে, যা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সহ্য করে চলা মানুষের মধ্যে দেখা যায়। তিনি পানির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, "মানুষ বলে গরম পানি আমাদের সর্দি লাগা থেকে রক্ষা করে এবং এটি সত্য — আমার অনেক বছর ধরে ভালো করে কোনো সর্দি বা ঠাণ্ডা লাগেনি। শীতকালে এই পানি শরীর গরম রাখে।"
এরপর তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, "কিন্তু আমার ত্বক। আমার পা। সেগুলো আগের মতো নেই। সেখানে চুলকানি হয় যা কখনই পুরোপুরি বন্ধ হয় না। মাঝে মাঝে ফুসকুড়িও হয়। আমি এটি নিয়ে বেশি কথা বলি না। বললেই বা কী পরিবর্তন হবে?"
দূষিত পানির দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে থাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি সুপ্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে রয়েছে ত্বকের সংক্রমণ, ছত্রাকজনিত রোগ, বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র কণা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণের ফলে শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা এবং ভারী ধাতু ও অন্যান্য শিল্প রাসায়নিকের কারণে দীর্ঘমেয়াদি নানা ঝুঁকি। কিন্তু এই নারীদের কারও জন্য কোনো পেশাগত স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেই।
তাদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও কখনো করা হয়নি। গরম পানি সুরক্ষা দেয়—এমন বিশ্বাসকে সরল অজ্ঞতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং এটি এমন মানুষের বাস্তবতাজনিত যুক্তি, যারা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে একটি ক্ষুদ্র স্বস্তির জায়গা খুঁজে পেয়েছেন এবং সেটিকেই নিরাপত্তার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
৫৫ বছর বয়সী আমেনা সুলতানার ভাষা আরও স্পষ্ট, সোজা সাপটা। তিনি বলেন, "পাঁচ বছর ধরে আমার পা ভালো নেই। ঘা হয়, আবার শুকিয়ে যায়, তারপর আবার হয়। সামর্থ্য থাকলে ওষুধ লাগাই। সামর্থ্য না থাকলে আবার সেই পা পানিতে ডুবিয়ে কাজ শুরু করি।"
নারীদের উপার্জিত অর্থ খুব নীরবে কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় হয়। স্কুলের বেতন, ওষুধ, চাল কেনা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধে এই টাকা খরচ হয়। একজন নারী তার নাতিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। আরেকজন শয্যাশায়ী স্বামীর দেখভাল করছেন। কয়েকজন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরাও কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। যেকোনো হিসাবেই এই আয় অল্প। কিন্তু যেখানে নিয়মিত চাকরির সুযোগ সীমিত এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে এই সামান্য আয়ই টিকে থাকা আর না টিকে থাকার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
অল্প বিরতির পর আবার কয়লার কাদা সংগ্রহে ফিরে গিয়ে মোরশেদা বেগম তার স্বভাবসুলভ সরলতায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, "আমি যদি এখানে আসা বন্ধ করে দিই, তাহলে আমার নাতি-নাতনিরা না খেয়ে থাকবে। বিষয়টা এতটাই সহজ। আমার জন্য কেউ দুঃখ অনুভব করুক, সেটা আমি চাই না। আমি শুধু চাই, কেউ আমাকে বুঝিয়ে বলুক—পাশের খনিটা কেন আমাকে একটা সম্মানজনক চাকরি দিতে পারে না।'
বিকেলের আলো পরিবর্তনের সাথে সাথে নালার পানি যখন একটি নিস্তেজ তামাটে রঙ ধারণ করে। তারপরও নারীরা কাজ চালিয়ে যান। তাদের কথোপকথন স্বাভাবিক ও সহজ। মাঝেমধ্যে হাসি শোনা যায়। কখনো ছোটখাটো তর্ক হয়। আবার এমন স্বাচ্ছন্দ্যময় ছন্দও দেখা যায়, যা দীর্ঘদিন একসঙ্গে কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়।
এখানে সংহতি বা একতা রয়েছে— যা প্রকৃত, স্ব-নির্মিত কিন্তু অতি-কাল্পনিক বা রোমান্টিক নয়। কোনো দাবি বা ব্যানার নিয়ে চলা আন্দোলনের সংহতি এটি নয়, বরং বরং এটি আরও নীরব এক সংহতি। এই জ্ঞান বা অনুভূতি যে আপনার পাশের নারীটি ঠিক বুঝতে পারছেন এর জন্য কী মূল্য দিতে হচ্ছে তাও তিনি এবং তা সত্ত্বেও তিনি এখানে আছেন।