পাহাড় থেকে পাতে: প্রাকৃতিক কৃষির ‘পাহাড়ি হাট’ ও নিরাপদ খাদ্যের গল্প
২০১১-১২ দিকের কথা। কৃষিতে তখন রাসায়নিক সার প্রয়োগের দাপট ক্রমেই বেড়ে চলছে। রঙিন-টাটকা সব সবজির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সবজির পুষ্টি ও গুণগত মান, বাড়ছে নিরাপদ খাদ্যের সংকট।
এমন এক সময়েই দেলোয়ার জাহান স্বপ্ন দেখেছিলেন যেভাবেই হোক, মানুষের কাছে বিষমুক্ত খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দেবেন। কৃষককে তার পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য দিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরিয়ে আনবেন কৃষিকে।
সে ভাবনা থেকেই কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে ২০১২ সালে শুরু করেন প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র। স্থান হিসেবে বেছে নেন মানিকগঞ্জ। এরপর ঢাকার মোহাম্মদপুরেও শুরু করেন এর কার্যক্রম। ২৪ অক্টোবর ২০১৪ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার মোহাম্মদপুরের সালিমুল্লাহ রোডে প্রাকৃতিক কৃষি ফসল বিপণন শুরু হয়েছিল। এটি চলে ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত। পরবর্তিতে একে সরিয়ে নেওয়া হয় মোহাম্মদপুরের রাজিয়া সুলতানা রোডে।
বুনো ফসলের হাট থেকে পাহাড়ি হাট
প্রথমদিকে এসব শাকসবজির যোগান আসত ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের আগমুন্দিয়া প্রাকৃতিক কৃষি খামার ও আরও তিনটি গ্রাম থেকে। সপ্তাহে তখন একদিন খোলা থাকত প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র। বর্তমানে ১৫টি জেলা থেকে আসছে এসব অর্গানিক পণ্য। দোকানও খোলা থাকছে প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত।
তবে দেলোয়ার জাহানের ইচ্ছে ছিল বুনো সবজি নিয়ে কাজ করার। যেগুলো মানুষের কোনোরকম পরিচর্যা ছাড়াই আপনাপানি বেড়ে ওঠে।
দেলোয়ার জাহান বলেন, 'আমি যেহেতু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। আমার অনেক আদিবাসী বন্ধু ছিল। তাদের খাদ্যভ্যাস সম্পর্কে আমার ধারণাও ছিল। তাছাড়া এই বুনো শাকসবজি, ফলমূলের পুষ্টিগুণও সাধারণভাবে চাষ করা ফসলের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।'
দেখা গেল, আদিবাসীরা তো আসছেই, সাথে বাঙালিদের মধ্যেও চাহিদা তৈরি হচ্ছে বুনো শাকসবজির। তাই, স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় নতুন খাবারের সাথে পরিচয় করাতেই ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয় প্রাকৃতিক কৃষির 'পাহাড়ি হাট' সফর। অবশ্য 'পাহাড়ি হাট' হওয়ার আগে অচাষকৃত বুনো ফসলের হাট নামে পরিচালিত হতো এটি।
সপ্তাহের অন্যান্য দিন মানিকগঞ্জ থেকে আসা কৃষিপণ্য ক্রয় বিক্রয় করা হলেও প্রতি রোববার সারাদিনব্যাপী চলে পাহাড়ি হাট।
কী থাকে সেই হাটে? উত্তর দিলেন কেন্দ্রের সহকারী বিপণন ব্যবস্থাপক উমং সিং। তিনি এই প্রাকৃতিক কৃষির সাথে আছেন দশ বছর ধরে।
রয়েছে ২০-৩০ রকমের পদ
উমং সিং জানালেন, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই হাটের কৃষি পণ্যের যোগান আসতে শুরু করে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও সদর থেকে। বান্দরবান থেকেও আসে। তবে তা খুবই সামান্য। খাগড়াছড়ির দিঘীনালা থেকেই মূলত যোগান আসে।
সেখানকার কৃষকদের অনেকেই দেলোয়ার জাহানের কাছ থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে কৃষিকাজ করেন বলে জানান উমং সিং। এছাড়া স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা পাহাড়ের গভীরে গিয়ে জুমচাষিদের কাছ থেকে শাকসবজি, ফলমূল সংগ্রহ করেন। তারপর সেখান থেকে এসব পণ্য নিয়ে আসা হয় দীঘিনালায়। আর এখান থেকেই সেসব পণ্য ঢাকায় পৌঁছে দেন প্রতিনিধিরা। পাহাড় থেকে আসা এসব কৃষিপণ্যের কিছু আসে একদম বুনো আদিম জঙ্গল থেকে, আবার কিছু আসে প্রাকৃতিকভাবে চাষ করে।
দেলোয়ার জাহান বলেন, 'পাহাড়ের কৃষকদের সেভাবে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। কিন্তু ফোনে বা সরাসরি নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, এখনও আছে। আমরা যে দলটি নিয়ে কাজ করছিলাম তাদের ইতোমধ্যেই প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে ধারণা ছিল। তাছাড়া, পাহাড়ি সব নিউজ আমরা ফলো করি। কখন কোন ফসল হয় সেগুলো নিয়ে কথা বলি। এছাড়া, আদিবাসী বাগানিদের সাথেও যোগাযোগ আছে যারা সবসময় আপডেট দিতে থাকে।'
সাধারণত পাহাড়ি হাটে ২০-৩০ রকমের পণ্য আসে। যেমন: পাহাড়ি বেল, আদি জাতের ভুট্টা, তারা(অনেকটা ডাটার মতো সবজি), খ্যায়াং আলু, পাহাড়ি মিষ্টি আলু, পাহাড়ি আদা, জুমের মিষ্টি কুমড়া, জুম মরিচ, জুম বেগুন, টমেটো, রাঁধুনি পাতা, ঢ্যাঁড়স, করলা, পাহাড়ি কলা, ঢেঁকি শাক, রক্তগোট ফল, আনারস, লেবু, কচুর লতি, রসুন, পিঁয়াজ, ঝিঙে, মুখ আলু, ঠান্ডা আলু, সুগন্ধি কচু,সবজি কাঁঠাল, কাঁচা আমসহ আরও নানা ধরনের পাহাড়ি ফল ও সবজি।
শাকের মধ্যে আছে: ঢেঁকিশাক, কাত্তোল ডিঙ্গি শাক, কচুশাক, টকপাতা। পাশাপাশি আছে পাহাড়ি চালের নানা ধরণ। যেমন ভাওয়ালাদিঘা, গাঞ্জিয়া, লাখাই, কালোজিরা, বাঁশফুল, কালোচাল, ঢেঁকি ছাঁটা চাল। এর মধ্যে ভাওয়ালাদিঘা(প্রতি কেজি ৬৮ টাকা) ও গাঞ্জিয়ার(প্রতি কেজি ৯৮ টাকা) চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তা পরিমাণে হয় কম।
উমং সিং গত এক দশকে দেখেছেন, একবার যারা এখানে আসেন, তাদের বড় অংশই পরে নিয়মিত ক্রেতায় পরিণত হন। ক্রেতার সংখ্যা শুধু পাহাড়ি হাটের দিন গড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো হয়ে থাকে। এদের অধিকাংশই নির্দিষ্ট বা স্থায়ী ক্রেতা। রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, বসুন্ধরা, গুলশানসহ নানা এলাকা থেকেও মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসেন।
আশেপাশে বাজার থাকা সত্ত্বেও নূরজাহান রোডের বাসিন্দা ইয়াসমিন আরা নিয়মিত আসেন এখানে। তার বিশেষ করে ডিম, দুধ, লাল আটা, ছাতু ও দেশি সবজির প্রতি তার বেশি আগ্রহ। দাম কিছুটা বেশি হলেও গুণগত মানের কারণেই তিনি এখানে আসেন। তাছাড়া পাহাড়ি খাবারের মধ্যে পাহাড়ি চাল, বিভিন্ন বুনো সবজি, শাক কিনে থাকেন।
ইয়াসমিন আরা বলেন, 'পোকা খাওয়া থাকলেও ঐ পাহড়ি বেগুন বা সবজি আমি কিনি কারণ এদের কাছে একদমই 'অর্গানিক' খাদ্য পাওয়া যায়। রাঁধুনি পাতা নামে এখানে একরকম পাতা আছে, ধনেপাতার পরিবর্তে ওটা ব্যবহার করি। টেস্টে চেঞ্জ আসে। আবার আমার বাচ্চাদের পছন্দ এখানের রক্তফল। পরিবারের সদস্যরাও একটু ভিন্নধর্মী খাওয়া পছন্দ করে। আর পুষ্টিগুণ তো আছেই।'
তিনি আরও বলেন, 'বিশেষ করে ডিম আর দুধ আমি এখান থেকেই বেশি কিনি। বাজারের প্রসেস করা দুধ আর ডিমের পুষ্টিগুণ নিয়ে আমার অনেক সন্দেহ কাজ করে। এখান থেকে আমি মুরগির ডিম কিনি ডজন ২৮৮ টাকা করে। দাম বেশি হলেও আমি জানি যে ডিমটা ভালো কিনছি। ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে হলেও এটুকু তো ভাবাই লাগে আসলে।'
কেন চাহিদার তুলনায় যোগান কম
উমং সিং জানান, 'পাহাড়ি পণ্যের দাম কিছুটা বেশি হওয়ার প্রধান কারণ পরিবহন ব্যয়। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ফসল সংগ্রহ করে ঢাকায় আনতে তিন থেকে চারটি ধাপ পেরোতে হয়। আবার, পাহাড়ে প্রথমদিকে দেশি বীজ ছিল, পরে ক্রমে ক্রমে হাইব্রিড ঢুকে গেছে পাহাড়ে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা যে প্রাকৃতিক এবং নৈতিক উপায়ে ফসলগুলো নিয়ে আসি এতে সময়, পরিশ্রম ও ব্যয় সবই বেশি। ফলে কৃষকরাও আগ্রহও পায়না আর উৎপাদনও কমে যায়। কিন্তু ঐ কমটুকুর জন্য পরিবহণ ব্যয় বেশি হচ্ছে এবং কৃষকদেরও যথাযোগ্য মজুরিও দিতে হচ্ছে। এসবকিছুর পর আমরা একটি মূল্য নির্ধারণ করি।'
তাই স্থানীয় বাজারে কোনো পণ্যের দাম ২০ টাকা হলে পাহাড়ি হাটে সেটি ৪০-৫০ টাকা হয়ে যায়। বা আরেকটু বেশিও হয়। তারপরও ইয়াসমিন আরার মত অনেক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ এসব পণ্য কিনছেন কেবল আস্থার জায়গা থেকে।
ইয়াসমিন জানান, মানুষের মধ্যে পাহাড়ি কৃষিপণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তবে সেই তুলনায় সরবরাহ অনেকটাই সীমিত। এর প্রধান কারণ, পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিক কৃষিকাজে যুক্ত কৃষকের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী নয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনও কমছে।
আবার পুরো ব্যাপারটি করা হয় আদিবাসী বা পাহাড়ের মানুষদের কথা ভেবে। এ ব্যাপারে দেলোয়ার জাহান বলেন, 'আমরা চেয়েছি পুরো জিনিসটা নৈতিকভাবে করতে। যখন পাহাড়ে যে খাবারের সংকট দেখা দেয়, আমরা সে খাবারটা তখন কম পরিমাণে আনি। এর আগে যেমন চালের সংকট ছিল, তখন আমরা চাল বা দানাজাতীয় কোনো ফসলই পাহাড় থেকে আনিনি।'
তবে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন থাকে। জুমচাষের জন্য এই মৌসুম সবচেয়ে উপযোগী হওয়ায় এ সময় পাহাড়ি অঞ্চলে নানা ধরনের শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদন বাড়ে। তাই বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই মৌসুমে পাহাড়ি হাটে বৈচিত্র্যও থাকে সবচেয়ে বেশি।
পাহাড়ি হাটের অধিকাংশ ক্রেতা মূলত আদিবাসীই। সমতল হাটের দিনগুলোর তুলনায় এ দিন ভিড় থাকে কম। আর যোগান কম হওয়ায় সবই শেষ হয়ে যায় মোটামুটি। রোববার শুধু এ হাট বসে এবং সারাদিনে বিকিকিনি চলে ৪০ হাজারের কাছাকাছি।
দেলোয়ার বলেন, 'প্রতিটা খাবারের যে পুষ্টিগুণ সেটা ঐ অঞ্চলের মানুষদের সাথে জেনেটিক্যালি ম্যাচ হয়। যেকারণে পাহাড়ি আমিষজাতীয় কিছু আমরা রাখিনা তেমন। বনমোরগ এনেছিলাম দুয়েকবার। কিন্তু বাঙালিরা দেশি মুরগী খেয়ে অভ্যস্ত। যেমন বনমোরগগুলোও হয় অনেক বড় বড়, অনেক মাংসল। এগুলো খেতে অভ্যস্ত না বাঙালিরা। কাপ্তাই থেকে মাছ আনার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ওটাও চলেনি। এছাড়া, পরিবহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত সমস্যার কারণে আমিষ জাতীয় খাবারগুলো আনা হয়না সাধারণত।'
তবে পাহাড়ি সকল কৃষিপণ্য মানেই ভেজালহীন এবং সম্পূর্ণ 'অর্গানিক' এমনটি মোটেও নয় বলে সতর্ক করেন দেলোয়ার জাহান।
তিনি বলেন, 'পাহাড়ে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার দেওয়া হয়। আমি নিজেও পাহাড়ে গেলে প্রচুর রাসায়নিক সারের গোডাউন, কীটনাশকের ব্যবহার দেখেছি।'
তিনি বলেন, 'আমাদের কাজ হলো, কৃষক সমাজের মধ্যে প্রাকৃতিক কৃষি সম্প্রসারণ করা এবং আদিবাসীদের মধ্যেও আমরা এ চেষ্টা করে যাচ্ছি।'