অনলাইনে ফাঁস নোলানের ‘দ্য ওডিসি’: আইম্যাক্সের বদলে ‘এক্স’-এ দেখল ২০ লাখের বেশি মানুষ
অস্কারজয়ী পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বহুল আলোচিত সিনেমা 'দ্য ওডিসি' আইম্যাক্স হলের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ দেখে ফেলেছেন ২০ লাখের বেশি মানুষ।
গত সপ্তাহান্তে এক ব্যবহারকারী কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে ১৭২ মিনিটের এই পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি এক্সে পোস্ট করলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
হলিউডের প্রভাবশালী গণমাধ্যম 'ভ্যারাইটি'-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার পোস্ট করার মাত্র তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ভিডিওটি ২১ লাখেরও বেশি দর্শক টানতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে ভিডিওটি মুছে ফেলা হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টটি স্থগিত করা হয়। এই পাইরেটেড সংস্করণটিকে ভ্যারাইটি 'হাই-কোয়ালিটি ' বলে বর্ণনা করেছে, যা এ পর্যন্ত কেবল সিনেমা হলগুলোতেই প্রদর্শিত হচ্ছিল।
ম্যাট ডেমন, অ্যান হ্যাথাওয়ে এবং রবার্ট প্যাটিনসনের মতো একঝাঁক তারকা অভিনীত এই মহাকাব্যিক সিনেমাটি নোলান সম্পূর্ণ ৭০ মিলিমিটার ফিল্মে শুট করেছিলেন। এটি মূলত আইম্যাক্স স্ক্রিনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যার সংখ্যা বিশ্বজুড়ে মাত্র ৪৫টির মতো।
সিনেমাটি এক্সে ভাইরাল হওয়ার পর এক ব্যবহারকারী মজা করে মন্তব্য করেছেন, 'একটি টুইটেই পুরো ওডিসি সিনেমা, যেমনটি নোলান চেয়েছিলেন।' আরেকজন লিখেছেন, 'টুইটারে একটি এমবেড করা ভিডিওতেই পুরো ওডিসি সিনেমা। অবিশ্বাস্য।'
মুক্তির মাত্র দুই সপ্তাহান্তের (উইকেন্ড) মধ্যে স্যার ক্রিস্টোফারের এই সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসে ৪৫ কোটি পাউন্ড আয় করেছে, যা ইউনিভার্সাল স্টুডিওর দেওয়া ১৮ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ডের বাজেটকে অনেক ছাড়িয়ে গেছে।
সিনেমা ফাঁসের এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইউনিভার্সাল স্টুডিও বলেছে, তারা তাদের কনটেন্ট সুরক্ষায় 'প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা' নিয়েছে।
স্টুডিওটি জানায়, 'আমরা সিনেমাটির অননুমোদিত পোস্টের বিষয়ে জানতে পেয়েছি এবং তাৎক্ষণিকভাবে এটি সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা কপিরাইট লঙ্ঘনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছি এবং আমাদের কনটেন্ট ও মেধা সম্পত্তি অধিকার রক্ষায় আইনি পন্থাসহ সব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
যদিও এই ফাঁসের ঘটনাটি 'দ্য ওডিসি'র বক্স অফিস সাফল্যে কোনো প্রভাব ফেলেনি, তবে এর জন্য কঠোর আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে। সিনেমা হলে চলাকালীন একটি উচ্চ মানের সিনেমা ইন্টারনেটে ফাঁস করা বাণিজ্যিক স্তরের জলদস্যুতা বা পাইরেসি হিসেবে গণ্য করা হয়, যার জন্য যুক্তরাজ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সীমাহীন জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আর্থিকভাবে ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলাও করতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এলন মাস্কের মালিকানাধীন 'এক্স' ইতিমধ্যেই ভিডিওটি সরিয়ে নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো স্থগিত করেছে। তবে মাস্ক নিজেই এই সিনেমার অন্যতম তীব্র সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
'১২ ইয়ার্স এ স্লেভ' সিনেমার জন্য অস্কারজয়ী কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুপিটা ইয়ংওকে 'হেলেন অব ট্রয়' চরিত্রে কাস্ট করার কারণে তিনি নোলানকে একজন 'শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী বর্ণবাদী' বলে অভিহিত করেছেন এবং হোমারের মহাকাব্যকে 'অপবিত্র' করার অভিযোগ তুলেছেন।
অবশ্য ক্রিস্টোফার জানিয়েছেন যে, এই চরিত্রের জন্য লুপিটা ইয়ংওই ছিলেন তার প্রথম পছন্দ, কারণ তিনি অত্যন্ত 'দৃঢ়চেতা ও ভারসাম্যপূর্ণ' একজন অভিনেত্রী।
'এল' ম্যাগাজিনকে নোলান বলেন, 'কাজ করার জন্য তিনি অসাধারণ একজন মানুষ এবং আমি সত্যিই এই চরিত্রের জন্য তাকে পেতে অত্যন্ত উদগ্রীব ছিলাম।'
সম্প্রতি নিজের কাস্টিং নিয়ে সমালোচনার জবাবে এই পরিচালক বলেন, 'এ ধরনের কাজ করতে গেলে এমন সমালোচনার মুখোমুখি হতেই হয়।' তিনি আরও যোগ করেন, 'সিনেমা দেখার আগে মানুষ যে আলোচনাগুলো করে—সেগুলো সবসময়ই অপ্রাসঙ্গিক, কারণ যারা আলোচনা করছে তারা এখনও জানেই না সিনেমাটি আসলে কেমন হয়েছে।'
এদিকে ইলন মাস্ক ঘোষণা করেছেন যে, তিনি তার নিজস্ব এআই প্ল্যাটফর্ম 'গ্রোক ইমাজিন' ব্যবহার করে হোমারের এই মহাকাব্যের একটি 'ঐতিহাসিকভাবে নিখুঁত' সংস্করণ তৈরি করবেন।
অনদিকে, যার করা ওডিসি অনুবাদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ক্রিস্টোফার এই ব্লকবাস্টার সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন বলে প্রচারণায় দাবি করেছিলেন, সেই ধ্রুপদী ভাষাবিদ এমিলি উইলসন সিনেমাটিকে 'আড়ম্বরপূর্ণ' কিন্তু 'ভাসাভাসা' এবং এর চিত্রনাট্য লেখাকে 'অত্যন্ত জঘন্য' বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসিকস বিভাগের প্রধান এবং ২০১৭ সালে হোমারের কবিতার অনুবাদক এমিলি উইলসন বলেন, প্রায় তিন ঘণ্টার এই সিনেমাটিতে 'কোনো বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য নেই' এবং এতে 'মনস্তাত্ত্বিক, আবেগীয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক গভীরতার চরম অভাব রয়েছে'।
'লন্ডন রিভিউ অব বুকস'-এ লেখা এক কঠোর নিবন্ধে তিনি লিখেছেন: 'নোলানের ওডিসিতে এমন অনেক উপাদানের অভাব রয়েছে যা মূল মহাকাব্যটিকে মহান করেছে। সময়, স্মৃতি, ইতিহাস, যুদ্ধ কিংবা একজন যোদ্ধার গৌরবময় প্রত্যাবর্তন এবং তার পরিবার, শত্রু, সহযোদ্ধা ও প্রতিবেশীদের জীবনের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে এটি কোনো বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দিতে পারেনি। এতে মনস্তাত্ত্বিক, আবেগীয়, রাজনৈতিক এবং নৈতিক গভীরতা নেই।'
তিনি আরও লিখেছেন, 'এর আখ্যানের কাঠামোটি কৃত্রিম ও চটকদার। লেখাটি অত্যন্ত জঘন্য। কোনো চরিত্রের কথা বা কাজের পেছনে কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ নেই। কোনো যৌন দৃশ্য নেই এবং সব খাবার দেখতেও জঘন্য লেগেছে।'
উইলসন যোগ করেছেন যে, এই স্ক্রিপ্টের কোনো অংশ যদি তিনি লিখতেন, তবে তিনি 'লজ্জাবোধ করতেন'।
