লাইট, ক্যামেরা, অ্যালগরিদম: যেসব কারণে ভারতীয় সিনেমায় এআই-এর প্রভাব বাড়ছে
বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র শিল্পে এখন এক নতুন তারকার আবির্ভাব ঘটেছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। হলিউডের তুলনায় ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প এআইকে অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে। তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সবার মধ্যে যে পুরোপুরি স্বস্তি রয়েছে, এমন নয়। খবর বিবিসি'র।
চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক বিবেক আঁচলিয়া যখন তার পরবর্তী সিনেমার পরিকল্পনা নিয়ে প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছিলেন, তখন তেমন আগ্রহ দেখাননি কেউই। এরপর তিনি এক ভিন্নধর্মী সহকারীর শরণাপন্ন হন, আর সেখান থেকেই তার প্রকল্পটি গতি পেতে শুরু করে।
চ্যাটজিপিটি ও মিডজার্নি-এর মতো এআই টুলের সহায়তায় আঁচলিয়া নিজেই একটি সিনেমা তৈরির পথ খুঁজে পান। মিডজার্নির মাধ্যমে তিনি সিনেমার দৃশ্য ও ভিজ্যুয়াল নির্মাণ করেন, আর চ্যাটজিপিটি ছিল তার পরামর্শকের ভূমিকায়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে এআই ব্যবহার করে তিনি সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁত করেছেন। আঁচলিয়া রসিকতা করে বলেন, 'আমার মনে হয় মিডজার্নি এখন আমাকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চেনে।'
আঁচলিয়া একজন গীতিকারও। তার কাছে বেশ কিছু অপ্রকাশিত রোমান্টিক গান ছিল, যেগুলোর জন্য তিনি বলিউড ঘরানার উপযুক্ত একটি পটভূমি খুঁজছিলেন। সেখান থেকেই 'নাইশা' নামের একটি রোমান্টিক সিনেমার গল্পের জন্ম। আঁচলিয়া বলেন, 'এআই যদি আমাকে নিজের শর্তে সিনেমা বানানোর সুযোগ দেয়, তাহলে আমি কেন স্টুডিওর অনুমোদনের জন্য বসে থাকব?'
ভারতের বৈচিত্র্যময় চলচ্চিত্র শিল্পে এআই এখন আর শুধু নতুন নির্মাতাদের শখের বিষয় নয়। বড় বাজেটের সিনেমার দৈনন্দিন কাজেও এটি জায়গা করে নিচ্ছে। প্রবীণ অভিনেতাদের বয়স কমিয়ে দেখানো (ডি-এজিং), কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করা (ভয়েস ক্লোনিং) কিংবা শুটিং শুরুর আগেই কোনো দৃশ্য কেমন হবে তা কল্পনা করা—চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রায় প্রতিটি স্তরেই এখন এআই-এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। কিছু স্টুডিও দ্রুত এই প্রযুক্তিকে আপন করে নিলেও, এর সঙ্গে নতুন ঝুঁকি ও নৈতিক প্রশ্নও সামনে আসছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে এআই ব্যবহারের এই চিত্র হলিউডের পরিস্থিতির ঠিক উল্টো। সেখানে অভিনেতা ও লেখকেরা এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি তুলেছেন। দুই বছর আগে তাদের ডাকা বড় ধরনের ধর্মঘটে টেলিভিশন শো ও বড় বড় সিনেমার কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তবে আঁচলিয়ার কাছে এআই ছিল এক ধরনের আশীর্বাদ। তার সিনেমার বাজেট প্রথাগত বলিউড সিনেমার তুলনায় ১৫ শতাংশেরও কম। ৭৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই সিনেমার প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি হয়েছে এআই ব্যবহার করে। এমনকি সিনেমার ট্রেলার প্রকাশের পর এর কম্পিউটার-জেনারেটেড নায়িকা 'নাইশা' হায়দ্রাবাদভিত্তিক একটি জুয়েলারি ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করার প্রস্তাবও পেয়েছে।
আঁচলিয়া বলেন, কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য পেতে হয়তো হাজারবার চেষ্টা করতে হয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও বড় বাজেটের প্রোডাকশন সামলানোর তুলনায় এটি অনেক কম চাপের। তিনি বলেন, 'এআই চলচ্চিত্র নির্মাণকে সবার জন্য সহজলভ্য করে তুলেছে। আজ বড় কোনো সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই একজন তরুণ নির্মাতা শুধু এআই ব্যবহার করেই সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারেন।'
শুধু নতুন নির্মাতারাই নন, প্রতিষ্ঠিত পরিচালকরাও এখন এআই-এর সহায়তা নিচ্ছেন। মালয়ালম ব্লকবাস্টার 'অজান্তে রান্দম মোশনম' (এআরএম)-এর পরিচালক জীতিন লাল একটি জটিল দৃশ্য তার ভিএফএক্স টিমকে বোঝাতে এআই ব্যবহার করেছিলেন। এখন তিনি তার পরবর্তী সিনেমার শুটিংয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের আগে এআই দিয়ে দৃশ্যগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন।
অন্যদিকে, পরিচালক অরুণ চন্দু মাত্র ২ কোটি ভারতীয় রুপি (প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার) বাজেটে একটি সায়েন্স ফিকশন সিনেমা নির্মাণ করেছেন। অরুণ হেসে বলেন, 'এই বাজেট একটি ভারতীয় বিয়ের খরচের চেয়েও কম।' তিনি তার মালয়ালম সিনেমা 'গগনচারী'-তে সামরিক বাহিনীর কিছু দৃশ্য তৈরির জন্য ফটোশপ ও 'স্টেবল ডিফিউশন'-এর মতো এআই টুল ব্যবহার করেছেন।
সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার শঙ্করন এ এস এবং কেসি সিদ্ধার্থনও পিছিয়ে নেই। তারা 'সাউন্ডলি' ও 'রিফর্মার'-এর মতো উন্নত এআই টুল ব্যবহার করছেন, যার মাধ্যমে নির্মাতারা নিজেদের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করেই খুব সহজে শব্দের কাজ নিখুঁত করতে পারেন। শঙ্করন বলেন, আগে শেষ মুহূর্তে কোনো নতুন ভাবনা এলে স্টুডিও বুক করার ঝামেলা পোহাতে হতো, এখন তা মুহূর্তের মধ্যেই করা সম্ভব।
তবে ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে এআই-এর এই অবাধ প্রবেশ নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এতে কি মানুষের সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সিনেমার মৌলিকত্ব কি ঝুঁকির মুখে পড়ছে?
পরিচালক জীতিন লালের মতো অনেকেই মনে করেন, এআই-এর পক্ষে মানুষের মতো আবেগ বা সাংস্কৃতিক গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়, যা একটি ভালো চিত্রনাট্যের জন্য অপরিহার্য। সম্প্রতি এর একটি বিতর্কিত উদাহরণও দেখা গেছে। ২০১৩ সালের জনপ্রিয় সিনেমা 'রাঞ্ঝনা'-র একটি তামিল সংস্করণ ২০২৫ সালের আগস্টে পুনরায় মুক্তি দেওয়া হয়। সেখানে মূল পরিচালকের অনুমতি ছাড়াই এআই ব্যবহার করে সিনেমার করুণ সমাপ্তি বদলে একটি সুখের সমাপ্তি যুক্ত করা হয়। ঘটনাটি চলচ্চিত্র মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা অবশ্য সংশয় প্রকাশ করেছেন যে, স্বল্প বাজেটের সিনেমা নির্মাণে এআই আদৌ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকেই এই প্রযুক্তির আবেগঘন প্রকাশের অভাব নিয়ে সমালোচনা করেছেন। পরিচালক শেখর কাপুর ২০২৩ সালে বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'এটি কোনো রহস্য তৈরি করতে পারে না, ভয় বা ভালোবাসাও অনুভব করতে পারে না।'
পশ্চিমা সিনেমায় অভিনেতাদের বয়স কমিয়ে দেখানোর (ডি-এজিং) প্রয়োগ নিয়ে মাঝেমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে—যেমন ২০২৪ সালের সিনেমা 'হেয়ার'-এ টম হ্যাংকসের ক্ষেত্রে হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের মালয়ালম থ্রিলার 'রেখাচিত্রাম'-এ প্রবীণ অভিনেতা মামুট্টির বয়স কমিয়ে দেখানোর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভক্তরা একে 'ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেরা এআই রূপান্তর' বলে অভিহিত করেন। সিনেমাটি সেই বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ আয়কারী মালয়ালম সিনেমা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে।
'রেখাচিত্রাম' সিনেমায় ৭৩ বছর বয়সী মামুট্টিকে ৩০ বছর বয়সী এক যুবকের চরিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেন মাইন্ডস্টেইন স্টুডিওর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ভিএফএক্স সুপারভাইজার অ্যান্ড্রু জ্যাকব ডিক্রুজ। তার দল প্রথমে ১৯৮৫ সালের সিনেমা 'কাঠোডু কাঠোরাম' থেকে ভিজ্যুয়াল ডেটা নিয়ে এআই-কে প্রশিক্ষণ দেন। তবে সেই ফুটেজের মান স্পষ্ট না হওয়ায় পরে তারা ১৯৮৮ সালের ৪কে সংস্করণের সিনেমা 'মনু আঙ্কেল' থেকে দৃশ্য ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফল পান।
'বাহুবলী' খ্যাত প্রবীণ অভিনেতা সত্যরাজের মতে, 'আমাদের মতো বয়সনির্ভর একটি শিল্পে যদি এআই আমার ক্যারিয়ারের মেয়াদ বাড়াতে পারে এবং আমাকে অ্যাকশন সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দেয়, তবে কেন আমি এটি ব্যবহার করব না?' তিনি ২০২৪ সালের তামিল সিনেমা 'ওয়েপন'-এ তার চরিত্রের উদাহরণ টানেন, যেখানে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তার বয়স ৭০ বছর থেকে কমিয়ে ৩০ বছর দেখানো হয়েছিল।
পরিচালক গুহান সেনিয়াপ্পান জানিয়েছেন, তিনি একটি নির্দিষ্ট স্টাইলের দৃশ্য নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, 'আমাদের হাতে পর্যাপ্ত বাজেট বা সময় ছিল না। এআই না থাকলে সিনেমার মুক্তি পিছিয়ে যেত।' তবে কাজের সময় এআই-এর কিছু সীমাবদ্ধতাও তার চোখে পড়েছে। গুহান আরু বলেন, 'আপনি যদি ডেমিগড-এর মতো শব্দ ইনপুট দেন, তাহলে এআই এমন ফলাফল দেয়, যেগুলো চেনা কঠিন। এআই আসলে ভারতীয় পুরাণের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে একেবারেই সচেতন নয়।'
সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ দৃশ্য নির্মাণে তিনি এখনও প্রথাগত স্টোরিবোর্ড শিল্পীদের ওপরই নির্ভর করেন। কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে গুহান বলেন, এআই টুলগুলো মূলত পশ্চিমা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় সেগুলো ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে ঠিকভাবে খাপ খায় না। তার মতে, 'আপনি চ্যাটজিপিটি দিয়ে কোনো আঞ্চলিক সিনেমার পরবর্তী পর্বের গল্প তৈরি করতে পারেন, কিন্তু তাতে মূল চিত্রনাট্যের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট যুক্ত করতেই হবে। আর সেই চিত্রনাট্য অবশ্যই একজন মানুষকেই লিখতে হবে।'
নির্মাতা এমজি শ্রীনিবাসও এআই-এর সাংস্কৃতিক অজ্ঞতা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন, যখন তিনি তার ২০২৩ সালের কন্নড় অ্যাকশন সিনেমা 'ঘোস্ট'-এ প্রধান অভিনেতা শিবা রাজকুমারের কণ্ঠ হুবহু নকল বা ক্লোন করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। আঞ্চলিক উচ্চারণ এবং কথা বলার নানা অসঙ্গতি সংশোধনে শেষ পর্যন্ত তাকে মানুষের সহায়তা নিতে হয়। তিনি বলেন, 'ট্রেলারটি যখন বিভিন্ন ভাষায় মুক্তি পেল, তখন তা বেশ ভালো সাড়া ফেলেছিল। দর্শকরা টেরই পাননি যে হিন্দি, তেলুগু ও মালয়ালম সংস্করণে শিবা রাজকুমারের কণ্ঠটি আসলে তার নিজের ছিল না।'
সেনিয়াপ্পান ও শ্রীনিবাস—উভয়েরই মত, ভারতের মতো ভাষাগতভাবে বৈচিত্র্যময় দেশে এআই এখনও সাংস্কৃতিক ও আবেগগত সূক্ষ্মতা পুরোপুরি ধরতে পারছে না। সে কারণেই এই ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত জরুরি।
পরিচালক অরুণ চন্দু নিজের সৃজনশীলতাকে ধরে রাখতে বর্তমানে একটি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি একে নিজের একটি 'ক্লোন' তৈরি করার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। প্রাক্তন আলোকচিত্রী হিসেবে চন্দু তার কাজের ধরন, বিশেষ কম্পোজিশন, রঙের ব্যবহার ও দৃশ্যশৈলী একটি এআই মডেলে ইনপুট দিচ্ছেন, যাতে সেটি তার শৈল্পিক সত্তাকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারে।
তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু ঝুঁকি। মানুষের মেধাস্বত্ব বা শিল্পীদের অবয়ব অন্যায়ভাবে ব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ছে, কারণ ভারতে এআই-এর অপব্যবহার ঠেকাতে কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। বিনোদন জগতের আইনজীবী ও 'অ্যাটর্নি ফর ক্রিয়েটরস'-এর প্রতিষ্ঠাতা অনামিকা ঝা বলেন, 'এ বিষয়ে কোনো একক বা পূর্ণাঙ্গ আইন নেই।' বর্তমানে ভারতে কোনো ব্যক্তির কণ্ঠ বা অবয়ব ব্যবহারের যে আইনি সুরক্ষা রয়েছে, তা মূলত সরাসরি বা রেকর্ড করা পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এআই দিয়ে তৈরি হুবহু নকলের ক্ষেত্রে আইন এখনো স্পষ্ট নয়। অনামিকা ঝার মতে, আইন প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
এআই-এর কারণে যেসব চলচ্চিত্রকর্মীর কাজ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাদের সুরক্ষার বিষয়েও শ্রম আইনে কোনো বিশেষ বিধান নেই। তবে অনেক নির্মাতা এই প্রযুক্তির নৈতিক দিক নিয়ে ভাবছেন। পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার সৃজিত মুখার্জি তার 'পদাতিক' সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ের এবং 'অতি উত্তম' সিনেমায় উত্তম কুমারের কণ্ঠ এআই দিয়ে তৈরি করেছেন। সৃজিতের মতে, সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মৃত শিল্পীদের পরিবারের অনুমতি নিয়ে কাজ করলে এতে কোনো নৈতিক সংকট তৈরি হয় না। তবে অনামিকা ঝা সতর্ক করে বলেন, ভারতে মৃত্যুর পর কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়। এর ফলে আইনি কাঠামোর অভাবে মৃত ব্যক্তির অনুমতি ছাড়াই তার কণ্ঠ বা চেহারা ব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো 'আনক্যানি ভ্যালি'। এআই দিয়ে তৈরি ছবি অনেক সময় মানুষের চোখে কিছুটা অদ্ভুত বা কৃত্রিম মনে হতে পারে। এ ছাড়া এই প্রযুক্তি অনেক সময় ভুল বা অবাস্তব দৃশ্য তৈরি করে, যাকে বলা হয় 'হ্যালুসিনেশন'। ভিএফএক্স বিশেষজ্ঞ ডিক্রুজ বলেন, হাসির ভঙ্গি বা চুলের একটি গোছা সামান্য এদিক-সেদিক হলেই দর্শকরা সেই কমতিগুলো ধরে ফেলেন।
পারডু ইউনিভার্সিটির অনিকেত বেরা ১৮৯৯ সালের একটি পুরোনো ফুটেজ এবং সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী' নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন, এআই সিনেমার ছায়া বা কনট্রাস্টের মতো সূক্ষ্ম বিষয়গুলো অনেক সময় কমিয়ে দেয়, যা সিনেমার সামগ্রিক মেজাজ নষ্ট করে। তিনি বলেন, 'এআই রূপক বা প্রতীকী বিষয় বোঝে না, এটি কেবল প্যাটার্ন অনুমান করে।' অনিকেত সতর্ক করে জানান, এভাবে এআই যদি দৃশ্যভাষা বদলে দেয়, তাহলে ইতিহাস বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সৃজিত মুখার্জির কাছে অবশ্য এআই ছিল স্বপ্নপূরণের একটি হাতিয়ার। এআই ছাড়া দুইজন মৃত অভিনেতাকে পর্দায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো না। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুরো প্রকল্পটিই মানুষের ওপর নির্ভরশীল ছিল—চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে আইনি অনুমতি নেওয়া পর্যন্ত। ইতিবাচক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'আতঙ্কিত না হয়ে মানুষের উচিত এআই-এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। একে আয়ত্ত করুন এবং নিজের কাজে ব্যবহার করুন। এটি আপনার সৃজনশীলতাকে গিলে ফেলার কোনো দানব নয়; বরং সৃজনশীলতায় সহায়তা করে।'
তবু অনেকের কাছেই এআই-এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। অরুণ চন্দু বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই বিষয়ে একটি কোর্স পড়ান। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের দুটি সিনেমা বানাতে বলেন—একটি এআই ব্যবহার করে এবং অন্যটি সম্পূর্ণ প্রথাগত পদ্ধতিতে। তিনি লক্ষ্য করেন, এআই দিয়ে তৈরি সিনেমা দ্রুত ও সহজে বানানো গেলেও মানুষের ছোঁয়ায় তৈরি সিনেমাটিই সব সময় বেশি সূক্ষ্ম ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
