‘দ্য সারপেন্ট’-এর আড়ালের নায়ক, ‘বিকিনি কিলার’কে দুবার ধরিয়ে দেয়া পুলিশ কর্মকর্তা, এবার নেটফ্লিক্সের পর্দায়
বিবিসি-নেটফ্লিক্সের 'দ্য সারপেন্ট'- সিরিজ এর বদৌলতে ফরাসি সিরিয়াল কিলার চার্লস শোভরাজের অপরাধ জগৎ সম্পর্কে অনেকেই জানেন। তবে এবার নেটফ্লিক্সের নতুন চলচ্চিত্র 'ইন্সপেক্টর জেন্দে' তুলে ধরেছে এক ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তার প্রায়-অজানা এক গল্প, যিনি এই কুখ্যাত খুনিকে একবার নয়, দুবার গ্রেপ্তার করেছিলেন।
ছবিতে সেই পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বলিউড অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী এবং শোভরাজের চরিত্রে দেখা যাবে জিম সর্বকে।
১৯৮৬ সালের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে পুলিশ ও অপরাধীর মধ্যে তিন সপ্তাহ ধরে চলা এক রুদ্ধশ্বাস বিড়াল-ইঁদুর দৌড়ের খেলা দেখানো হয়েছে। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর ভারতে আবারও আলোচনায় এসেছেন সেই আসল 'সুপারকপ' মধুকর জেন্ডে।
অবসরপ্রাপ্ত ৮৮ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা বলেন, তিনি মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক কুখ্যাত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেও 'আন্তর্জাতিক অপরাধী শোভরাজের' কুখ্যাতিই তাকে 'সুপারকপ' হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছিল।
ভারতীয় বাবা ও ভিয়েতনামী মায়ের সন্তান শোভরাজ ফ্রান্সে বেড়ে ওঠেন। ১৯৭০ সালে দিল্লির পাঁচ তারকা হোটেল অশোকের একটি গয়নার দোকানে দুঃসাহসিক চুরির মাধ্যমে তিনি ভারতে প্রথম সংবাদ শিরোনাম হন।
এর এক বছর পর ইন্সপেক্টর জেন্দে তাকে মুম্বাই থেকে গ্রেপ্তার করলে সংবাদপত্রগুলো লেখে, 'মুম্বাই পুলিশের মুকুটে আরেকটি পালক'। কিন্তু দিল্লি পুলিশের কাছে হস্তান্তরের কয়েকদিনের মধ্যেই অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথার অজুহাতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বাথরুমের পাইপ বেয়ে পালিয়ে যান শোভরাজ।
পরবর্তী পাঁচ বছরে তিনি হয়ে ওঠেন এক কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার। ছদ্মবেশ ধারণ ও জেল পালানোর ক্ষমতার জন্য তার নাম হয় 'দ্য সারপেন্ট'। এশিয়ায় হিপি পর্যটকদের, বিশেষ করে তরুণীদের লক্ষ্যবস্তু করায় তাকে 'বিকিনি কিলার' নামেও ডাকা হতো।
১৯৭৬ সালে ৪০ জন ফরাসি ছাত্রকে মাদক খাইয়ে ডাকাতির চেষ্টার অভিযোগে শোভরাজ দিল্লিতে ধরা পড়েন এবং ১২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে তিহার জেলে যান। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ১৬ মার্চ নিজের জন্মদিন—এই মিথ্যা কথা বলে জেলের কর্মী ও বন্দীদের মাদক মেশানো মিষ্টি খাইয়ে তিনি জেল থেকে পালিয়ে যান।
মি. জেন্দে বলেন, শোভরাজের পালানোর খবরটি তাকে 'বিচলিত' করেছিল। এর দুই সপ্তাহ পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে ডেকে পাঠান। কারণ, তিনিই অতীতে একবার 'বিকিনি কিলারকে' ধরেছিলেন। তাকে আবারও শোভরাজকে ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নেটফ্লিক্সের নতুন চলচ্চিত্রে মূলত ইন্সপেক্টর জেন্দে ও তার দলের গোয়ায় গিয়ে শোভরাজকে ধরার অভিযানটিই দেখানো হয়েছে। নিজের বই 'মুম্বাই'স মোস্ট ওয়ান্টেড'-এ জেন্ডে লিখেছেন, এই অভিযানটি তার জন্য নানা কারণে উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
গোয়ার বিভিন্ন পানশালা ও সৈকতে দিনের পর দিন খোঁজাখুঁজির পর দলটি নিশ্চিত হয়, শোভরাজ সেখানেই আছেন। এরপর তারা পোরভোরিমের ও'কোকুইরো রেস্তোরাঁর ওপর নজরদারি শুরু করেন, কারণ ধনী বিদেশিদের জন্য দ্রুত আন্তর্জাতিক কল করার সুবিধা একমাত্র সেখানেই ছিল।
৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় দলটি রেস্তোরাঁয় অবস্থান নেয়। তখন টিভিতে ভারত-পাকিস্তান হকি ম্যাচ চলছিল, সঙ্গে ছিল একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। মি. জেন্দে তার বইতে লিখেছেন, 'রাত সাড়ে ১০টার দিকে শোভরাজ যখন ভেতরে ঢোকে, আমি সঙ্গে সঙ্গেই তাকে চিনে ফেলি। তাকে না দেখার দশটি বছর যেন এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।'
'জেন্দাবাদ' থেকে রাষ্ট্রপতির পদক
এই চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তার মি. জেন্দেকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়। পরদিনের সংবাদপত্রগুলো তাকে 'জিন্দাবাদ' শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে 'জেন্দাবাদ' বলে অভিবাদন জানায়। বলিউডের শীর্ষ অভিনেতা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—সবাই তার সঙ্গে দেখা করেন।
তিনি সাহসিকতার জন্য রাষ্ট্রপতির পদকও লাভ করেন। তবে সবচেয়ে সেরা স্বীকৃতিটি আসে সেই রেস্তোরাঁর কাছ থেকে, যারা তার নামে একটি 'জেন্দে প্লাটার' চালু করে।
অন্যদিকে, শোভরাজ আবারও কারাগারে ফিরে যান এবং আরও এক দশক সাজা খাটেন। পরে তিনি দাবি করেন, থাইল্যান্ডে প্রত্যর্পণ এড়ানোর জন্যই তিনি পালানোর নাটক করেছিলেন, যেখানে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছিল।
১৯৯৭ সালে মুক্তি পেয়ে ফ্রান্সে ফিরে গেলেও ২০০৩ সালে নেপালে গিয়ে ফের গ্রেপ্তার হন এবং ১৯ বছর কারাভোগ করেন। ২০২২ সালে বয়সের কারণে মুক্তি পেয়ে তিনি ফ্রান্সে ফিরে যান।
মি. জেন্দেকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি এখনও শোভরাজের খোঁজ রাখেন কি না, তার সহজ উত্তর, 'সে তার সাজা খেটেছে। বয়স এখন ৮১। আমি তাকে নিয়ে আর ভাবি না।'
