প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চট্টগ্রাম সফরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান শ্রমিক নেতাদের
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
জাতীয় স্বার্থ ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটির আধুনিকায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের এক দিন আগে আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে স্বাগত জানিয়ে স্কপ বলেছে, দেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর টার্মিনালগুলোর নিয়ন্ত্রণ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় রাখা এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শ্রমিকদের এ সংগঠনটি বলেছে, গত ৮ অক্টোবর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যে চুক্তি সই হয়েছে তার আর্থিক শর্ত, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা না করে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা উচিত হয়নি। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশের পাশাপাশি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
স্কপের তথ্য অনুযায়ী, এনসিটির অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি নির্মাণে সরকার প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। জমিসহ টার্মিনালটির সম্পদের মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সংগঠনটি বলেছে, চুক্তি সইয়ের সময় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এবং প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার আর্থিক সুবিধা ও ঝুঁকি জনসমক্ষে তুলনা করে দেখাতে হবে।
বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়বে—এমন দাবির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে স্কপ।
সংগঠনটির ভাষ্য, স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটিতে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ (২০ ফুট দীর্ঘ একক কনটেইনারের সমপরিমাণ) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। অথচ ডিপি ওয়ার্ল্ডের জন্য প্রকাশিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ।
এ পরিস্থিতিতে টার্মিনাল পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এদিকে, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) বিদেশি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে স্কপ।
সংগঠনটির আশঙ্কা, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়তে পারে।
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ইজারা চুক্তির আওতায় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিগুলোও স্বাধীনভাবে নিরীক্ষারও দাবি জানিয়েছে স্কপ। একই সঙ্গে বন্দরশ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, বেতন, ভাতা, পেনশন, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এবং যৌথ দর-কষাকষির অধিকার সুরক্ষায় লিখিত নিশ্চয়তা চেয়েছে সংগঠনটি।
মোংলা ও পায়রা বন্দরের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিদেশি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে স্কপ।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ কনটেইনার পরীক্ষা করতে পারবে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনটি।
তাদের মতে, চুক্তিতে এ বিষয়ে কী বলা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্কপ বলেছে, তারা বন্দর আধুনিকায়ন ও বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহারের পক্ষে। নতুন টার্মিনাল নির্মাণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওটি) মডেলের মতো ব্যবস্থাকেও সমর্থন করে সংগঠনটি।
তবে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ জাতীয় স্বার্থ, আর্থিক সুবিধা ও শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করে তারা।
এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল, চুক্তির শর্ত প্রকাশ, স্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি গঠন, স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় টার্মিনাল আধুনিকায়ন এবং পিসিটিতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে স্কপ।
জাতীয় সম্পদ ও বন্দরের ওপর দেশীয় নিয়ন্ত্রণ রক্ষায় শ্রমিক, বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্কপের চট্টগ্রাম বিভাগের যুগ্ম সমন্বয়ক খোরশেদুল আলম, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম জামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক আবদুল বাতেন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ এবং বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের নগর কমিটির সভাপতি নুরুল আবছার তৌহিদসহ শ্রমিক নেতারা।
