২০২৯ সালে শেরেবাংলা নগরে সরানো হচ্ছে সচিবালয়, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রায় ৩১.৫৮ একর জমিতে ৩টি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। এতে মোট প্রায় ৩৩.১৬ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস থাকবে। নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্সে ৩,৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বর্তমান সচিবালয়ের পরিবর্তে শেরেবাংলা নগর থেকে সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে এ প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নতুন সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করে।
বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গণি বলেন, 'রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঢাকার আগের মাস্টারপ্ল্যানে সচিবালয়ের জন্য এ জায়গা বরাদ্দ রয়েছে। এটি নান্দনিক স্থাপনা হবে, যার নকশায় স্থপতি লুই আই কানের মূল ভাবনার সঙ্গে যোগসূত্র থাকবে। তবে পুরোপুরি একই নকশায় এটি তৈরি হবে না। সেই ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ সচিবালয় নির্মাণ করা হবে।'
তিনি বলেন, সচিবালয়ের আশপাশে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বেশ কিছু ভূগর্ভস্থ সড়ক ও আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে। সব অবকাঠামোর মাধ্যমে ওই এলাকার যানবাহন চলাচলের প্রবাহ ঠিক রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নাসিমুল গনি বলেন, 'সচিবালয়ের মূল নকশার ধারণাটি অনুমোদন করা হয়েছে। তবে এখনো বৈদ্যুতিক, প্লাম্বিং, স্থাপত্য ও কাঠামোগত প্রকৌশল নকশাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ বাকি রয়েছে। এসব কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। আরও কিছু বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।'
সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, 'সচিবালয়ের ১৬টি মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে মূল ভবনের বাইরে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও বর্তমানে সচিবালয়ের এই অংশে অফিস করছেন। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী এখানে অফিস করছেন। প্রধানমন্ত্রী চান, পুরো সরকার যেন সমন্বিতভাবে আরও দ্রুত কাজ করতে পারে। এ লক্ষ্যেই সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।'
নতুন সচিবালয় নির্মাণের অর্থায়ন কোথা থেকে হবে, জানতে চাইলে নাসিমুল গনি জানান, বাংলাদেশ সরকারই এ প্রকল্পের অর্থায়ন করবে। তবে এ জন্য কত টাকা ব্যয় হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে যে ইকোনমিক প্রায়োরিটি, সেই প্রায়োরিটিতে এই টাকাটা এবং এই কনসেন্ট্রেশন এটা সার্টেনলি একটা প্রায়োরিটি।'
নতুন সচিবালয় নির্মাণে মোট ব্যয় কত হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এখনো ব্যয়ের হিসাব নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রাক্কলন তৈরির কাজ চলছে।'
ভবনের মোট আয়তনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'বর্গফুটের হিসাব থেকে ব্যয়ের একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।'
বর্তমানে আবদুল গনি রোডে সচিবালয়ের যে স্থাপনা রয়েছে, স্থানান্তরের পর সেখানে কী করা হবে, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, 'ওই জায়গায় ভবিষ্যতে ভালো কিছু করা হতে পারে। পুরান ঢাকায় প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম ও আদালত-সংক্রান্ত অনেক বিষয় আটকে রয়েছে। সেগুলোর কিছু সেখানে স্থানান্তর করা হতে পারে। তবে সেখানে ঠিক কী করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।'
সচিবালয় স্থানান্তরের ধারণাটি প্রধানমন্ত্রী নিজে দিয়েছেন, নাকি সরকারের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি এসেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে নাসিমুল গনি বলেন, 'এটি সরকারেরই পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রী এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সরকারের আইডিয়া ছিল।'
মন্ত্রি পরিষদ বিভাগের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বর্তমান সচিবালয় ১৭.৫৭ একর জমির ওপর অবস্থিত। সেখানে মোট ১৩টি ভবন রয়েছে, যার মধ্যে ৮টি স্বাধীনতার আগে নির্মিত। পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবনটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত। এসব ভবন ভূমিকম্প সহনীয় করে নির্মাণ করা হয়নি। ঢাকা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রম এসব ভবনে পরিচালনা করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।
বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় ১৮.৭৬ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত জায়গার চাহিদা এবং সচিবালয় কমপাউন্ডের বাইরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এক জায়গায় আনতে আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে ১৪টি ১২ তলা ভবনের পাশাপাশি একটি মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি মাল্টিপারপাস হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া ও একটি ডাকঘর থাকবে। তিনটি বেজমেন্টের পাশাপাশি ২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংসহ মোট ৩,৮০০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করা হবে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০% জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখা হয়েছে।
বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অধ্যাদেশ
এদিন মন্ত্রিসভা কমিটি বিদ্যুৎ খাতে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও ভর্তুকির চাপ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে 'বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, 'জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০-এর আওতায় আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩,০০০-৪,০০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কোম্পানির ভবনের ছাদে বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিকে বলা হয় অপারেশনাল এক্সপেনডিচার (ওপেক্স) মডেল। যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় রয়েছে, সেগুলোর জন্য ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (ক্যাপেক্স) মডেলেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, বেসরকারি সেবাদাতার মাধ্যমে এসব ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ, ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে বিদ্যুতের অংশ নির্ধারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের বিষয়ে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬; ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ এবং বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-তে প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট বিধানের অভাব রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ
বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রটারডাম কনভেনশনে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, 'রটারডাম কনভেনশন অন দ্য প্রাইর ইনফর্মড কনসেন্ট প্রসিডিউর ফর সার্টেন হ্যাজার্ডাস কেমিক্যালস অ্যান্ড পেস্টিসাইডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড' নামের এই আন্তর্জাতিক চুক্তিটি বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পূর্ব সম্মতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার কাঠামো দেয়।
তিনি বলেন, '১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গৃহীত কনভেনশনটি ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়। বর্তমানে এতে ১৬৭টি দেশ সদস্য হিসেবে রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) অন্য সদস্য দেশগুলো ইতোমধ্যে এতে যুক্ত হয়েছে।'
এজন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই কনভেনশনে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব করেছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কনভেনশনে যুক্ত হলে বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহযোগিতা, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন, রাসায়নিকের তথ্যভান্ডার তৈরি এবং রাসায়নিকের গতিবিধি অনুসরণে সহায়তা পেতে পারে বাংলাদেশ। এ ছাড়া কনভেনশনের আওতাভুক্ত রাসায়নিকের বিষয়ে আমদানি-রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়া, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আইনি তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। কনভেনশনের সচিবালয় থেকেও এ বিষয়ে কারিগরি সহায়তা নেওয়া যাবে।
'মহিলা ও শিশু' মন্ত্রণালয়ের নাম হচ্ছে 'নারী ও শিশু'
মন্ত্রিসভার বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে 'নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়' করার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়টির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
