সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্নভঙ্গ, শুক্রবার রাতে দেশে ফিরছেন নৌকাডুবিতে বেঁচে যাওয়া নিউজিল্যান্ডের ৩ নাগরিক
২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড ও তার পরিবারের তিন সদস্য। নিজেদের পরিকল্পনা মোতাবেক তারা কক্সবাজার শহরের বাঁকখালীর নদীর তীরে 'আইল্যান্ড গার্ল' নামের একটি অভিজাত ও অত্যাধুনিক নৌযানে বসবাস করতেন।
এই নৌযানে করেই সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণ করে দেশে ফেরার কথা ছিল তাদের। তবে তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনাসংলগ্ন নাজিরারটেক এলাকায় সমুদ্রে ডুবে যায় 'আইল্যান্ড গার্ল' নামের নৌযানটি।
সেসময় পরিবারটির ৩ সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও আলবার্ট (১৬) নামের এক কিশোর নিখোঁজ হয়। তার মৃতদেহ উদ্ধার হয় পরের দিন।
স্বপ্নভঙ্গের দেড় মাস পেরিয়ে নানা আইনি প্রক্রিয়া, পার্সপোর্ট-ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া প্রভৃতি জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে শুক্রবার মধ্যরাতে নিজ দেশে ফিরবেন পরিবারটির জীবিত তিন সদস্য। তারা হলেন- জন এডওয়ার্ড, তার স্ত্রী বেলা (৩৬) ও ছেলে রালফ (১৩)।
গত ২৫ আগস্ট নৌকাডুবির পর থেকে তারা তিনজন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। দেড় মাস ধরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে অবস্থান করেছেন তারা। তাদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশও মোতায়েন করা ছিল।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান জানান, 'পরিবারটির তিন সদস্যের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার মধ্যরাতে তারা নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হবেন।'
তিনি জানান, 'নৌকাডুবির সময় পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু নথি হারিয়ে যায়। ফলে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা সহজ ছিল না।'
তিনি আরও জানান, 'বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন ও ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়।'
বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে আছে বিধ্বস্ত স্বপ্নের 'আইল্যান্ড গার্ল', আর পাশের শ্মশানে রয়েছে এক সন্তানের দেহাবশেষ
পরিবারটি নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমালেও বাঁকখালী নদীর তীরে রেখে যাচ্ছে কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি নৌযান 'আইল্যান্ড গার্ল'। আর নদীর খুব কাছের একটি শ্মশানে রেখে যাচ্ছে তাদের কিশোর সন্তান আলবার্টের দেহাবশেষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, জন এডওয়ার্ড ও তার পরিবারের ৩ সদস্য গত আড়াই বছর ধরে কক্সবাজারের উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করেছেন। কক্সবাজার শহরের এসএম পাড়া উপকূলে তৈরি করা হয়েছিল তাদের শখের নৌযানটি। তারা এটির নাম দেন 'আইল্যান্ড গার্ল'। এটি ছিল অত্যাধুনিক একটি নৌযান, যা নির্মাণে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল জানান, 'নৌযানটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল।ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্র ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি নৌযানটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল।'
তিনি জানান, পরিবারটির চার সদস্য এই নৌযানটিতেই বসবাস করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে নৌযানটি কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে, নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করে রাখা ছিল।
নৌযানটির নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কে স্থানীয় জেলে আবদুর রহমান বলেন, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে 'আইল্যান্ড গার্ল' তৈরি করা হয়েছিল।
জানা যায়, গত ২৫ আগস্ট বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়। সেসময় পরিবারটির তিন সদস্যকে উদ্ধার করা হয় এবং একদিন পর একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে নুনিয়াছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীতে বাঁকখালী নদীতে ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে 'আইল্যান্ড গার্ল'।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, 'নিহত আলবার্টের মরদেহ উদ্ধারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরের শ্মশানে তার শেষকৃত্য করা হয়।'
এক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও তার পরিবারের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
এর আগে চলতি বছরের গত ৮ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে পরিবারটি ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন।
পরেরদিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো এ বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
ওইদিন বার্তায় বলা হয়েছিল, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড তার পরিবারের ৪ সদস্যসহ বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা একটি কাঠের বোট বা ট্রলারের মাধ্যমে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্যোগ নেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি পর্যালোচনা করে পরিবারটিকে এই ধরনের সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করে এবং চলতি বছরের গত ১ মার্চ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয়।
ওই সময় তাদের পাসপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি তাদের পাসপোর্টের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে বোটসহ অবস্থান করছিলেন।
এ অবস্থায় গত বুধবার রাতে একদল দুষ্কৃতিকারী তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। খবর পেয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের একাধিক আভিযানিক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালায়। অভিযানকারিরা দক্ষতার সঙ্গে পর্যটকদের জীবিত উদ্ধার করে।
