জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামো সংস্কারে অংশ নিতে চায় বিশ্বব্যাংক, ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অবকাঠামো খাতের সংস্কারে সহায়তার হাত বাড়াতে চায় বিশ্বব্যাংক। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন নীতিনির্ধারক ও সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করতে বিশ্বব্যাংকের একটি চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল আজ ঢাকায় পৌঁছেছে। সফরটি ৩ অক্টোবর শুরু হয়ে চলবে আগামী ৭ অক্টোবর পর্যন্ত।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অবকাঠামো বিষয়ক আঞ্চলিক প্র্যাকটিস ডিরেক্টর পঙ্কজ গুপ্তের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি এই সফরে অংশ নিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল এইচ মার্টিন সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব মো. আহসান কিবরিয়া সিদ্দিকীকে চিঠি দিয়ে চার দিনের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিনিধি দলটি সফরকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নীতিগত পর্যালোচনার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন, সরবরাহ নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসার, খাতভিত্তিক সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারের মতো অগ্রাধিকারমূলক বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে।
ইআরডি-কে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কৌশল নির্ধারণে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেশে চলমান ও পাইপলাইনে থাকা বিভিন্ন জ্বালানি প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
জ্বালানি খাতের তীব্র আর্থিক চাপ ও আমদানি সংকট
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিপুল আমদানি ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশকে মারাত্মক আর্থিক চাপ সামলাতে হচ্ছে। দেশের শিল্প খাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্বিঘ্ন সরবরাহ বজায় রাখতে প্রচুর পরিমাণে এলএনজি, জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি করতে হলেও ডলার সংকটজনিত কারণে বিল পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির বাজারমূল্য বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ওপর ঘাটতি ও আর্থিক দায় উত্তোরোত্তর বাড়ছে।
উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির বিপুল ব্যয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। অভ্যন্তরীণ গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদার করা হলেও এলএনজি আমদানির ব্যয় সামাল দেওয়াই সংস্থাটির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও (বিপিসি) মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে সংস্থাটির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২,৮৭৫.৬৬ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে তেল আমদানি সচল রাখতে বিপিসি তাদের স্থায়ী ও বিভিন্ন প্রকল্পের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা স্থানান্তর বা উত্তোলন করে গত সাত মাস ধরে পরিচালনা ব্যয় মিটিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে একলাফে ২০ টাকা বাড়ালেও বিপিসি আবারও ভর্তুকির আবেদন জানায়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তেল আমদানির জন্য বিপিসিকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রদান করে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও চলমান উদ্যোগ
জ্বালানি আমদানির সংকট নিরসনে বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলাকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। সংস্থাটি 'এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট'-এর আওতায় এলএনজি আমদানিতে গ্যারান্টি ও অর্থায়ন দিতে ২০২৫ সালের জুনে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করে। পরবর্তীতে গত ১৫ মে আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করায় এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের মোট অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার। সফরকালে এই প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ অর্থায়নের বিষয়েও আলোচনা প্রাধান্য পাবে।
অপরদিকে, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, দ্রুততম সময়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন এবং বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বিশ্বব্যাংক দেশে দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা করে আসছে। সংস্থাটির অর্থায়নে 'স্কেলিং-আপ রিনিউয়েবল এনার্জি প্রজেক্ট'-এর অধীনে ফেনীর সোনাগাজীতে ৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (ইজিসিবি)। এ ছাড়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) মাধ্যমে রুফটপ সোলার ও গ্রামীণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন জোগানো হচ্ছে। স্রেডাকে (এসআরইডিএ) বায়োগ্যাস পাইলট প্রকল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে কারিগরি সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ পর্যালোচনা
বিশ্বব্যাংকের এই সফরের পরিধি কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামো ও নগর উন্নয়ন সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলোও বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
প্রতিনিধি দলটি চট্টগ্রামে 'বে টার্মিনাল উন্নয়ন প্রকল্প' এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'ঢাকা-চট্টগ্রাম লজিস্টিক ও পরিবহন করিডোরে' বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিয়ে বৈঠক করবে। এর বাইরে বাংলাদেশ রেলওয়ের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি, নৌপরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় টেকসই নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবস্থাপনা সংস্কার, স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করা হবে।
চার দিনের সফরকালে বিশ্বব্যাংকের দলটি অর্থ মন্ত্রণালয়; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়; রেলপথ মন্ত্রণালয়; নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়; পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইডকলসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
