ভুয়া এজেন্সির নামে ১২ বছরে বিদেশে পাচার ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি, চক্রের অন্যতম হোতা আরজু গ্রেপ্তার
ভুয়া ইমিগ্রেশন এজেন্সির নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে প্রতারাণার অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। প্রায় ১২ বছর ধরে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি এই চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আরজুসহ অন্যান্য গ্রেপ্তারকৃতের একটি ব্যাংক হিসাবে গত এক বছরে পৌনে ২ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীটি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।
এর আগে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে বনানী সি ব্লক এলাকা থেকে আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১।
ব্রিফিংয়ে এসআরবি-৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, 'আরজু দীর্ঘদিন মিশরে অবস্থান করছিলেন এবং তাকে সার্বক্ষণিক ট্র্যাকিং করা হচ্ছিল। কয়েকদিন আগে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং আগামী বৃহস্পতিবার পুনরায় মিশরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এনএসআই-এর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।'
তিনি আরো জানান, চক্রটি ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিত। সার্বিয়া ও বেলারুশ হয়ে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে কামরুন নাহার, ফাতেমা, আঞ্জুমান আরা, পারভেজ, ফিরোজ ও মেহেদী হাসানসহ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আরজুর বিরুদ্ধে।
গত ১৬ জুলাই মানবপাচারের শিকার কামরুন নাহার সহায়তার জন্য এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টি তদন্তে আসে।
তদন্তে জানা যায়, চক্রটি প্রথমে ভুক্তভোগীদের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠাত। পরে নেপাল বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মিশর ও লিবিয়ায় নিয়ে সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হতো।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, এভাবে পাচারের শিকার তিনজন কৌশলে দেশে ফিরতে সক্ষম হলেও দুজন বিদেশে আটকা পড়েন। কামরুন নাহারকে মিশরে এবং আঞ্জুমান আরাকে শ্রীলঙ্কায় রাখা হয়। পরে তারা এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আরজু রহমানকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা যায়।
বাহিনীটি জানায়, এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আরও প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগীর যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের ঘটনা, মামলা, অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটির প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে জনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে জানিয়েছে এসআরবি।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে এসআরবি জানায়, আরজু রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে অবৈধভাবে লোক পাঠানো ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন সময়ে লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির নাম ব্যবহার করে তিনি বিদেশে লোক পাঠানোর কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
এর মধ্যে 'আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড' ও 'নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড'সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেকার যুবক ও প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের টার্গেট করে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো বলেও জানানো হয়েছে।
এসআরবি-৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, 'গ্রেপ্তার আরজু রহমানের গত এক বছরের একটি ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্টে মোট ১ কোটি ৭০ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।'
চক্রটির বিরুদ্ধে ভুয়া ভিসা ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে নারীদের বিদেশে পাচার, বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা এবং রাজি না হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
এসআরবি জানায়, লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো নারীকে জিম্মি করে রাখা, শারীরিক নির্যাতন এবং সিগারেট দিয়ে শরীরে জখম করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসআরবি আরো জানায়, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই বাহিনীর অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানবপাচারের অভিযোগে মোট ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
