ভারতীয় দর্শনার্থীর সংখ্যায় ধস, ২০২৫ সালে বিদেশি পর্যটক আসা কমেছে ৭.৬ শতাংশ
পশ্চিমা ও পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ থেকে পর্যটক বাড়লেও ভারত থেকে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশিদের আগমন আগের বছরের তুলনায় ৭.৬ শতাংশ কমেছে। দেশে আসা এই বিদেশিদের মধ্যে অবকাশযাপনকারী পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী উভয় ধরনের দর্শনার্থীই রয়েছেন।
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) প্রস্তুত করা পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন বিদেশি দর্শনার্থী এসেছেন। এর আগে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ জন ও ২০২৩ সালে ছিল ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন।
বাংলাদেশে বিদেশি আসার ক্ষেত্রে উৎস দেশ হিসেবে ভারত শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও গত বছর দেশটি থেকে দর্শনার্থী আসার হার ২৬.১ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালে ভারত থেকে ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৮৫ জন এলেও ২০২৫ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬০৯ জনে। পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং উভয় পক্ষেরই ভিসা দেওয়ার হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে দেওয়ার কারণে এই সৃষ্টি হয়েছে।
ভারত ছাড়া গত বছর বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী আসা শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, চীন, জাপান, জার্মানি ও সুইডেন।
তবে পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অফিশিয়াল পরিসংখ্যানকে শুধু 'অবকাশযাপনকারী পর্যটক' হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের একটি বড় অংশই বিদেশি পাসপোর্টধারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিক, যারা মূলত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এছাড়া একটি অংশ আসেন ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কিংবা বিভিন্ন সভা, সম্মেলন ও প্রদর্শনীতে অংশ নিতে। পরিসংখ্যানে তাদেরকে বিদেশি পর্যটক হিসেবে গণ্য করা হলেও সাধারণ অবকাশযাপনকারী ভ্রমণকারীদের তুলনায় পর্যটন খাতে তাদের ব্যয়ের পরিমাণ অনেক কম।
ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটর সৈয়দ মাহবুবুল আলম বুলু টিবিএসকে বলেন, 'পরিসংখ্যানের দিক থেকে পর্যটক হলেও তারা অবকাশ কাটাতে আসেন না। বহু প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন; তারা হোটেলের বদলে সাধারণত আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেই ওঠেন।'
তার প্রাক্কলন অনুসারে, মোট বিদেশি আগমনের মধ্যে প্রকৃত অবকাশযাপনকারী পর্যটকের অংশ কোনোভাবেই প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
এই পার্থক্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অবকাশযাপনকারী পর্যটকরা সাধারণত হোটেল, যাতায়াত, রেস্তোরাঁ, ট্যুর গাইড ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে তুলনামূলক অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তৈরি ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট-এর তথ্যমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে আসা বিদেশি দর্শনার্থীদের ব্যয়ের সিংহভাগই হয়েছিল আবাসন খাতে (৪১.৪৮ শতাংশ)। এর পরের অবস্থানে ছিল খাবার ও পানীয় (১৯.১৬ শতাংশ), কেনাকাটা ও অন্যান্য পণ্য ও সেবা (১২.৮৪ শতাংশ) এবং সড়কপথে যাত্রী পরিবহন (৫.৬৫ শতাংশ)।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আসা দর্শনার্থীদের সেবা প্রদান-সংক্রান্ত খাত থেকে রপ্তানি আয় ২০২০-২১ অর্থবছরের ১ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বুলু জানান, ২০২৫ সালে তার কোম্পানি প্রায় ১২০-১২৫ জন বিদেশি অবকাশযাপনকারী পর্যটককে সেবা দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিলেন ইতালীয় পর্যটক। আগামী অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটনের ভরা মৌসুমে তার কোম্পানি রিভারাইন ট্যুরের মাধ্যমে আরও ১৫০ থেকে ২০০ জন পর্যটক আসবেন বলে আশা করছেন তিনি।
ভারতীয়দের আগমনে ধস
২০২৫ সালে বাংলাদেশে আসা মোট বিদেশি দর্শনার্থীর ৩৩.৩ শতাংশ ছিলেন ভারতীয়। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৪১.৬ শতাংশ ও ২০২৩ সালে ৪৫ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, ২০২৩ সালে আসা ২ লাখ ৯৪ হাজার ৬৬৮ জন ভারতীয় দর্শনার্থীর তুলনায় এই সংখ্যা ছিল ৩৪ শতাংশ কম।
পর্যটক আসার এই পতন এতটাই বড় ছিল যে, অন্যান্য শীর্ষ উৎস দেশগুলো থেকে আসা দর্শনার্থীর প্রবৃদ্ধিও এর কারণে ম্লান হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জন্য বিদেশি দর্শনার্থী আসার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস দেশ হলো যুক্তরাজ্য। ২০২৫ সালে দেশটি থেকে দর্শনার্থী আসার হার ৪.৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৮৮ জনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ২৪ জন। এরপরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। দেশটি থেকে ২.১ শতাংশ বেড়ে মোট ১ লাখ ৮ হাজার ১৮২ জন দর্শনার্থী এসেছেন, যা আগের বছর ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৯৮৭ জন।
কানাডা থেকে ৩৩ হাজার ৯৪ জন দর্শনার্থী এসেছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ৬.৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে ৩১ হাজার ১৮২ জন, যা ৬.৬ শতাংশ বেশি। ইতালির ক্ষেত্রে এই প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী ছিল; দেশটি থেকে দর্শনার্থী আসার হার ১২.১ শতাংশ বেড়ে ২১ হাজার ৯৫২ জনে উন্নীত হয়েছে।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে বাংলাদেশি দর্শনার্থী যাওয়ার হারও ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। আগের বছর ১৭ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি ভারতে গেলেও গত বছর তা কমে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজারে নেমে এসেছে।
ওই বছর ভারতে সার্বিকভাবে বিদেশি পর্যটক কমেছিল ৯ লাখ ৩০ হাজার। এর চেয়েও বড় সংখ্যা ছিল বাংলাদেশি দর্শনার্থী কমার পরিমাণ, প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার। এর ফলে ভারতে বিদেশি পর্যটক যাওয়ার উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থান থেকে পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে।
চীন ও জাপানের অবস্থান শক্তিশালী
এশিয়ার বাজারগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে চীনে। আগের বছরের ৪ হাজার ৭১৫ জন থেকে একলাফে ৪৪.৪ শতাংশ বেড়ে চীন থেকে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮০৮ জনে উন্নীত হয়েছে।
জাপান থেকে দর্শনার্থী আসার হার ১৪.৩ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৪৭২ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া জার্মানি থেকে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা ৫ হাজার ৪৪১ জন থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৭৪০ জন হয়েছে। ৪ হাজার ৪২৬ জন থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৭৫৪ জন দর্শনার্থী নিয়ে শীর্ষ ১০-এর তালিকা পূর্ণ করেছে সুইডেন।
এই পরিসংখ্যানগুলো বাংলাদেশের বিদেশি দর্শনার্থী বাজারের কাঠামোতে ধারাবাহিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এর মাধ্যমে দেখা যায়, ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমছে; অন্যদিকে পশ্চিমা দেশ ও পূর্ব এশিয়ার কিছু বাজার থেকে দর্শনার্থী আসার পরিমাণ বাড়ছে।
ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটর ও জার্নি প্লাসের প্রধান নির্বাহী তৌফিক রহমান জানান, পর্যটন খাত এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাচ্ছে। আসন্ন পিক মৌসুমের জন্য ইতিমধ্যেই খোঁজখবর ও অনুসন্ধান আসতে শুরু করেছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, '২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সার্বিকভাবে বাজার প্রায় ৭-৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের জন্য যে পরিমাণ অনুসন্ধান পাচ্ছি, তা বেশ ইতিবাচক মনে হচ্ছে।'
তিনি আরও জানান, অক্টোবর মাসের জন্য ইতিমধ্যেই বুকিং মিলেছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে পর্যটকদের চাহিদা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রচার ও ভ্রমণ সতর্কতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন খাতে বেশি ব্যয় করেন, এমন বিদেশি অবকাশযাপনকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভ্রমণ সতর্কতা ও বিদেশে বাংলাদেশের পর্যটন প্রচারের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
ভ্রমণ সতর্কতা ও নিরাপত্তাজনিত ধারণা বিদেশি ট্যুর অপারেটর ও ভ্রমণকারীদের সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা জোরালো হলে ভ্রমণ বিমার সুবিধাও সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে ট্যুর অপারেটররা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের পক্ষে প্রচার চালাতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র গত ৩১ জুলাই বাংলাদেশের জন্য তাদের ভ্রমণ সতর্কতা হালনাগাদ করেছে। এতে সতর্কতার মাত্রা 'লেভেল ৩' বা 'ভ্রমণ পুনর্বিবেচনা করুন' থেকে কমিয়ে 'লেভেল ২' বা 'বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন'-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
তৌফিক বলেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকার পরও ওইসব দেশ থেকে পর্যটক আসার হার তুলনামূলকভাবে বেশ কম। তাই এসব বাজারে বাংলাদেশের প্রচার কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোকে পর্যটন প্রচারে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। এ লক্ষ্যে ভ্রমণবিষয়ক সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ও ট্যুর অপারেটরদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর পরামর্শ দেন তিনি, যাতে তারা সরাসরি ঘুরে দেখে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন।
পর্যটন সুবিধা বাড়াতে মহাপরিকল্পনা
পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনের বিকাশে সরকার দেশের প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, বোর্ড পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা ও সেবার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং মহাপরিকল্পনার আওতাধীন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা ও সেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমাদের বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে। আমরা সেই প্রকল্পগুলো খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চাই।'
বিদেশি পর্যটক টানার বিষয়ে ফারুকী জানান, ট্যুরিজম বোর্ড আন্তর্জাতিক মহল, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার করবে।
তিনি বলেন, 'অন্যান্য দেশের নাগরিকরা যাতে বাংলাদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত হন, সেজন্য আমরা আন্তর্জাতিক কমিউনিটি, দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই।'
