একসময় বসেছেন বার্মার সংসদে, আজ তারা শরণার্থী: রোহিঙ্গাদের সেই ইতিহাস তুলে ধরছে রোহাং সেন্টার
শরণার্থী শিবির রোহিঙ্গাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠার বহু আগে, এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা বার্মার সংসদে বসেছেন, সরকারি পরিচয়পত্র পেয়েছেন এবং জাতীয় বেতারে নিজেদের ভাষায় অনুষ্ঠান শুনেছেন।
রাজনৈতিক, নাগরিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সেই খণ্ডচিত্রগুলো এখন উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী বসতির ক্যাম্প ৬-এর রোহাং হেরিটেজ সেন্টার নামে পরিচিত একটি সংগ্রহ কেন্দ্রের বাঁশের দেয়ালে স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রে ২০০টির বেশি নথি, আলোকচিত্র, মানচিত্র, সংবাদপত্রের কাটিং, বই এবং অন্যান্য নথিপত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, রোহিঙ্গাদের তরুণ প্রজন্মকে এমন একটি অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, যা শিবিরজীবনের কারণে তাদের কাছ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
গত ৯ বছরে বাংলাদেশে দুই লাখ ১৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু জন্মেছে। আর প্রায় ১২ লাখ শরণার্থীর মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বর্তমানে হেরিটেজ সেন্টারটিতে ২০০টির বেশি সামগ্রী প্রদর্শন করা হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "এর মধ্যে অনেকগুলো এমন নথি, যা রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।"
রাজনৈতিক অতীত
কেন্দ্রটির একটি অংশে এমন একটি সময়কে তুলে ধরা হয়েছে, যখন বার্মার আইনসভায় রোহিঙ্গা রাজনীতিকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল।
সুলতান আহমেদ ও এম এ গাফফার নামে দুজন ১৯৪৭ সালে বার্মার সংবিধায়ক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৫১-৫২ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম সংসদীয় নির্বাচনে জুরা বেগম, যিনি দাও আয় ন্যুন্ত নামেও পরিচিত, মাংডু দক্ষিণ আসন থেকে জয়লাভ করেন এবং সেই নির্বাচনে নির্বাচিত মাত্র দুজন নারীর একজন হন।
কেন্দ্রটিতে সুলতান মাহমুদের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বুথিডং থেকে নির্বাচিত হন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী উ নুর সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ঘটনাও এখানে নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
১৯৯০ সালের নির্বাচনে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ফর হিউম্যান রাইটস দলের চারজন প্রার্থী সংসদীয় আসনে জয়ী হন। তবে সামরিক সরকার দেশব্যাপী ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি এবং পরে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়।
তরুণ রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ আনসারের কাছে এসব নথি এই সম্প্রদায়ের বর্তমান রাষ্ট্রহীন অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইতিহাস প্রদর্শন করে।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সংসদ সদস্য এবং সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের উপস্থিতি রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের একসময় যে রাজনৈতিক অবস্থান ছিল তা তুলে ধরেছে।"
নাগরিক নথি থেকে অস্থায়ী পরিচয়পত্র
'মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক নথিপত্র' শিরোনামের একটি প্রদর্শনীতে পরিচয়পত্র, জন্ম ও বিবাহের সনদ, পারিবারিক জনসংখ্যা গণনার তালিকা, জমির নথি এবং ভোটসংক্রান্ত নথি প্রদর্শন করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৫০-এর দশকে বার্মায় চালু হওয়া নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর অনেককেই জাতীয় নিবন্ধন কার্ড দেওয়া হয়েছিল।
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন এবং এর পরবর্তী নাগরিকত্ব যাচাই ব্যবস্থার পর তাদের আইনগত অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
পরবর্তীতে মিয়ানমারের স্বীকৃত ১৩৫টি 'জাতীয় জাতিগোষ্ঠীর' সরকারি তালিকা থেকেও রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া হয়।
১৯৮৯ সাল থেকে পুরোনো নিবন্ধন নথির পরিবর্তে নাগরিকত্ব যাচাই কার্ড চালু করা হলে অনেক রোহিঙ্গাকে নতুন এই কার্ড দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের ব্যাপকভাবে অস্থায়ী নিবন্ধন কার্ড দেওয়া হয়, যা সাধারণভাবে 'সাদা কার্ড' নামে পরিচিত ছিল।
২০১৫ সালে এসব কার্ড বাতিল করা হয় এবং এরপর জাতীয় যাচাই কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তবে অনেক রোহিঙ্গা এই প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, এর মাধ্যমে তাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে নয়, বরং বিদেশি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রটিতে ২৫টি মসজিদের আলোকচিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে, যেগুলো ১৮২৩ সালের আগের বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে বার্মা সম্প্রচার সেবায় রোহিঙ্গা ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচারের নথিও সেখানে রাখা হয়েছে।
স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা
রোহাং হেরিটেজ সেন্টারটি ৬ নম্বর ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গাজী শরিফুল হাসানের উদ্যোগে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছে।
উপসচিব হাসান বলেন, অনেক শরণার্থী কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গবাদিপশু পালন ও ব্যবসার মতো বিষয়গুলো সহজেই স্মরণ করতে পারেন। তবে তাদের রাজনৈতিক অতীতের কথা স্মৃতি থেকে ক্রমেই মুছে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, "এই ইতিহাস সংরক্ষণ এবং শিশু ও তরুণদের তাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই কেন্দ্রটি তৈরি করা হয়েছে।"
বালুখালীর ১০ নম্বর ক্যাম্পে অবস্থিত একটি পৃথক রোহিঙ্গা কেন্দ্রও এই স্মৃতির আরেকটি দিক সংরক্ষণ করছে।
সেখানে গ্রামীণ জীবন, ফুটবল, ঐতিহ্যবাহী কুস্তি, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন, ঈদের মেলা, নাটক ও সিনেমার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ডেনমার্কের শরণার্থী পরিষদের সহায়তায় পরিচালিত এই কেন্দ্রটিতে ঘরের ভেতরের খেলাধুলা, সংগীত, পাঠচক্র, চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়।
১০ নম্বর ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরাফাতুল আলম বলেন, এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো তরুণদের মনে করিয়ে দেওয়া যে, "এই ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরজীবনই তাদের পুরো পরিচয় নয়।"
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমানের কাছে দুটি উদ্যোগের বৃহত্তর উদ্দেশ্যও এটাই।
তিনি বলেন, "এখানে তারা যে শরণার্থী জীবন দেখছে, সেটিই তাদের পুরো ইতিহাস নয়। তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ছিল। আমরা চাই, তরুণ প্রজন্ম সেই ইতিহাস বুঝুক এবং সেই সম্পর্ক ধরে রাখুক।"
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ বারবার থমকে গেছে।
এর মধ্যে ২০২১ সালের মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
আপাতত তাই এসব নথি কক্সবাজারের বাঁশের তৈরি স্থাপনাগুলোর ভেতরেই রয়ে গেছে।
সেগুলো এমন এক অতীতকে সংরক্ষণ করে চলেছে, যে অতীত এসব নথি নিয়ে পড়াশোনা করা অনেক রোহিঙ্গা শিশু নিজের চোখে কখনো দেখেনি।
