৯.৫ ঘণ্টার পথ পেরোতে ৭৫ ঘণ্টা—ইঞ্জিন সংকটে থমকে গেছে রেলের পণ্য পরিবহন
যে পথ পাড়ি দিতে সময় লাগার কথা ছিল মাত্র সাড়ে নয় ঘণ্টা, তা পাড়ি দিতে লেগেছে প্রায় তিন দিন। গত ২৮ জুন চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা একটি মালবাহী ট্রেন হাসানপুর-নাঙ্গলকোট সেকশনে এসে ইঞ্জিন বিকলের কারণে আটকে পড়ে। বিকল্প কোনো লোকোমোটিভ বা রেলইঞ্জিন না থাকায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে ট্রেনটি। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৭৫ ঘণ্টা পর গন্তব্যে পৌঁছায় এটি।
এ ঘটনা বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালনায় বিদ্যমান তীব্র সংকটেরই একটি বাস্তব চিত্র। সড়ক পরিবহনের তুলনায় একসময় যে রেল সার্ভিসকে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সচল ইঞ্জিনের চরম সংকটে তা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
লোকোমোটিভের তীব্র সংকট
বাংলাদেশ রেলওয়ের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে চলতি বছরের ১ জুন থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৫৩ দিনে পণ্যবাহী ট্রেন বিলম্বের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসময় ইঞ্জিন সংকটে ৪৯টি পণ্যবাহী ট্রেন মোট ১,১৪৭ ঘণ্টা বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছেছে। এসব বিলম্বের ৪০ শতাংশের বেশি ঘটেছে কেবল পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে নিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করার কারণে। সবচেয়ে চরম বিলম্বের ঘটনাটি ঘটেছিল চট্টগ্রামগামী একটি জ্বালানিবাহী তেল ট্রেনের ক্ষেত্রে—ইঞ্জিন খুলে অন্য ট্রেনে যুক্ত করায়, ট্রেনটি আখাউড়ায় টানা ১২ দিনেরও বেশি সময় (২৯৬ ঘণ্টা) আটকে ছিল।
সংকটের এই ভয়াবহতা ফুটে উঠছে রেলের নিজস্ব পরিসংখ্যানেও।
২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে ২,৭৭০টি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করেছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১,৪৬৭টিতে—যা প্রায় ৪৭ শতাংশ পতন। একই সময়ে পণ্য পরিবহন থেকে রেলের আয় ৩৫৪.৪০ কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়ায় ১৬৩.৩১ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো– পণ্যবাহী সার্ভিসে দৈনিক ইঞ্জিন বরাদ্দের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া। ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য পরিবহনে দৈনিক গড়ে ৯.৯১টি ইঞ্জিন বরাদ্দ থাকলেও—২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩.১৪টিতে।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০২২ সালের মার্চ মাসে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটসহ অন্যান্য রুটে ১৬১টি কনটেইনার ট্রেনসহ মোট ২১৭টি পণ্যবাহী ট্রেন চলেছিল। ওইসময় গড়ে ১০-১২টি ইঞ্জিন বরাদ্দ ছিল পণ্যবাহী খাতে। বর্তমানে তা দুটি বা তিনটিতে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী, পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় রেলপথে পণ্য পরিবহনে টন-কিলোমিটার প্রতি খরচ পড়ে ০.০২৩ ডলার, যেখানে সড়কে এই খরচ ০.০৬০ ডলার। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় একটি ২০ ফুটের কনটেইনার রেলে পাঠাতে খরচ হয় ৯,৭০০ থেকে ১৬,১০০ টাকা, অথচ সাধারণ কাভার্ড ভ্যানে লাগে ১৭,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা—যা সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের সময়ে ২৬,০০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
খরচ এত বেশি হলেও, রেলে সময়মতো মালামাল পৌঁছানোর নিশ্চয়তা না থাকায়— উৎপাদক, জ্বালানি কর্তৃপক্ষ ও আমদানিকারকরা বাধ্য হয়ে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পুরনো প্রযুক্তি
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন সংকটের পেছনে পুরনো ইঞ্জিন ও জটিল ক্রয় প্রক্রিয়াকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, "মিটারগেজের ইঞ্জিন বিশ্বব্যাপী কম চলে। এগুলোর যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া যায় না। এছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ; দুই-তিন বছর লাগে। বেশিরভাগ ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল অনেক আগে পেরিয়েছে। ৫০-৬০ বছরের পুরনো ইঞ্জিনও চলছে। নতুন ইঞ্জিন আমদানি না হওয়া পর্যন্ত সংস্কার বা মেরামত করেই চলতে হবে।"
অবকাঠামোগত ভুল পরিকল্পনার কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত রেলওয়ের ১২১টি প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যার মাধ্যমে ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কেনা হয় মাত্র ৪০টি নতুন ইঞ্জিন। অন্যদিকে, ৯০টিরও বেশি পুরনো লোকোমোটিভ—যার কিছু অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলছিল—পরিচালনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ৭০টি নতুন ইঞ্জিন কেনার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাব ১৪ বছর আটকে থাকার পর ২০২৪ সালে শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়।
অন্যত্র ইঞ্জিন সরাতেই আটকা পড়ছে মালবাহী ট্রেন
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৪৯টি পণ্যবাহী ট্রেনের মধ্যে অন্তত ১৪টি ট্রেন ২৪ ঘণ্টারও বেশি এবং ৬টি ট্রেন ৪৮ ঘণ্টা বা তার চেয়েও বেশি সময় বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছেছে।
মোট বিলম্বিত সময়ের ৪০ শতাংশের বেশি ঘটেছে পণ্যবাহী ট্রেন থেকে ইঞ্জিন খুলে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করার কারণে। অন্যান্য কারণের মধ্যে ছিল ইঞ্জিনের যান্ত্রিক ত্রুটি, জরুরি ডিউটি এবং যাত্রীবাহী ট্রেনকে আগে পথ ছেড়ে দিতে গিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন আটকে রাখা।
এর ফলে এক দুষ্টচক্রের সৃষ্টি হয়েছে।
যাত্রার সময় বা টার্নঅ্যারাউন্ড সময় বেড়ে যাওয়ায় ইঞ্জিন ও ওয়াগন দীর্ঘদিন আটকে থাকছে, এতে রেলের মোট ট্রিপের সংখ্যা কমে যায়। এতে রাজস্ব কমে যাওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি মালামাল সড়কপথে চলে যাচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি তেলবোঝাই ২০ ওয়াগনের একটি ট্রেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত ২০ আগস্ট থেকে চট্টগ্রাম পোর্ট ইয়ার্ডে ইঞ্জিনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল ৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত। অন্যদিকে সিলেট ডিপোর উদ্দেশে যাওয়া আরেকটি তেলবাহী ট্রেন ইঞ্জিন সংকটের কারণে ১৭ আগস্ট থেকে আটকে রয়েছে।
রেল ছেড়ে সড়কে ঝুঁকছে জ্বালানি পরিবহন
জ্বালানি তেল পরিবহনে এই ধস সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৮৮টি ট্রেনে করে ২৩,০০৪ ট্যাংকার জ্বালানি পণ্য পরিবহন করেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১২২টিতে ট্রেনে মাত্র ৭,৪৮০ ট্যাংকার জ্বালানি পরিবহন করা হয়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে রেলে জ্বালানি পণ্য পরিবহন কমেছে ৮০ শতাংশেরও বেশি। অথচ এখনও রেলে জ্বালানি পরিবহনের বড় চাহিদা রয়েছে। জ্বালানি বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সিলেট ডিপোতে প্রতি মাসে অন্তত ৩০টি, শ্রীমঙ্গলে ১২টি, রংপুরে ১০টি ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ডিপোতে ৬টি তেলবাহী ট্রেনের প্রয়োজন হয়।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, "রেলে জ্বালানি তেল পরিবহন নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। ইঞ্জিন সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ট্রেন বরাদ্দ দিতে না পারায়—আমরা উত্তরবঙ্গে যথাসময়ে জ্বালানি তেল পৌঁছাতে পারছি না। সড়কপথে পরিবহন করায় ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা রেলের সঙ্গে একাধিকবার মিটিং করেছি। কিন্তু, তারা আমাদের ট্রেন বরাদ্দ দিতে পারছে না।"
ব্যবসায়ীদের খরচ দ্বিগুণ
জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের পরিবহন ফলে সড়কপথে আরও সরে আসার কারণে দ্বি-মুখী ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে: একদিকে ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র তার অন্যতম নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রেলওয়েতে পণ্য পরিবহন খাতের সংকুচিত হতে থাকা অবদান থেকেই এর কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত পাঁচ বছরে পণ্যবাহী ট্রিপের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, আর এই খাত থেকে রাজস্ব আয়ও কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে পণ্য পরিবহনে দৈনিক গড়ে সর্বোচ্চ ১১.৬৮টি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হতো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ৬৮ শতাংশ কমে নেমে এসেছে মাত্র ৩.১৪টিতে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক টিবিএসকে বলেন, রেলওয়ের এসব সমস্যার চূড়ান্ত প্রভাব দিনশেষে ব্যবসা পরিচালনার খরচের ওপরই পড়ছে। তিনি বলেন, "ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। জনবল, রোলিংস্টক ঘাটতি আছে। ফলে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে।"
'ভারসাম্যহীন ব্যবস্থা'
বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক উল্লেখ করেন, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন বা রোলিং স্টক না কিনে কেবল নতুন নতুন লাইন সম্প্রসারণ করায় পুরো ব্যবস্থাটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। নতুন ইঞ্জিন না আসা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দুটি পথ খোলা থাকছে—কম খরচের অনির্দিষ্ট বিলম্বের রেল, অথবা বেশি খরচের কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো ট্রা্কে পণ্য পরিবহন।
তিনি বলেন, "অপরিকল্পিত বিনিয়োগের কারণে রেলের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো কোনো বাস্তব সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মুখে সুন্দর সুন্দর উপযোগিতার কথা বলত। কিন্তু তারা জানত যে, নতুন ট্র্যাক থাকলেও – কোচ ও ইঞ্জিনের অভাবে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে না। তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই।"
এক সাশ্রয়ী সেবা, যা আবার অনির্ভরযোগ্য
বাংলাদেশ রেলওয়ের পণ্য পরিবহন খাত এখন একটি অদ্ভুত বৈপরিত্যের মুখে পড়েছে।
দীর্ঘ দূরত্বে ভারী মালামাল পরিবহনে রেলপথ তুলনামূলক অনেক সাশ্রয়ী এবং এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা আইসিডি, জ্বালানি ডিপো, বিদ্যুৎকেন্দ্র, খাদ্য গুদাম ও শিল্প কেন্দ্রগুলোর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
কিন্তু ইঞ্জিনের অভাব, পুরনো যন্ত্রপাতি এবং অনিয়মিত সূচীর কারণে রেলে পণ্য পরিবহনের এই আর্থিক সুবিধা বাস্তবে কোনো কাজে আসছে না।
ব্যবসায়ীদের জন্য বিষয়টি এখন আর কেবল "কম খরচের ট্রেন বনাম বেশি খরচের ট্রাক"-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা দাঁড়িয়েছে "কম খরচের অনির্ভরযোগ্য ট্রেন বনাম বেশি খরচের সময়মতো পৌঁছানো ট্রাকে"-এ দুয়ের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার ওপর।
