এলাকার উন্নয়নে সংরক্ষিত নারী এমপিদের তদারকির উদ্যোগ ‘অসাংবিধানিক’: স্পিকারকে ৬৭ সংসদ সদস্যের চিঠি
প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন কাজের তদারকি বা সমন্বয়ের দায়িত্ব সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের দেওয়ার উদ্যোগকে 'অসাংবিধানিক ও বেআইনি' দাবি করে আপত্তি জানিয়েছেন ৬৭ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
'জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪' সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে তারা জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
গত ২০ আগস্ট স্পিকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫), মো. আব্দুস সাত্তার (নীলফামারী-১), আলফারুক আব্দুল লতিফ (নীলফামারী-২) এবং ওবায়দুল্লাহ সালাফী (নীলফামারী-৩)।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামাল হোসেন তার ফেসবুক পেজে চিঠিটি প্রকাশ করেন। তিনি বিষয়টির সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন দুপুরে টিবিএসকে বলেন, আজ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকার সম্প্রতি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের সাধারণ সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কাজের তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে আইন সংশোধনের খসড়া তৈরি করেছে। তবে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের আলোকে এ উদ্যোগ সাংবিধানিক ও আইনি নীতির পরিপন্থী।
সংসদ সদস্যরা চিঠিতে সংবিধানের ৬৫(২), ৬৫(৩), ১২১ ও ১২৪ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৩০০টি আসনের বিপরীতেই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা ও ভোটার তালিকা রয়েছে। অন্যদিকে, সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং এসব আসনের নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক এলাকা নেই।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের নির্বাচন ও দায়িত্বের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা সীমানা নির্ধারণের সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্যদের দাবি, সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এ অবস্থায় সংরক্ষিত আসনের এমপিদের সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হলে একই এলাকায় 'দ্বৈত শাসন' তৈরি হবে।
এটি 'কুদরত-ই-ইলাহী পনীর বনাম বাংলাদেশ' মামলার রায় এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
চিঠিতে ভারত, পাকিস্তান, তানজানিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, নিউজিল্যান্ড ও রুয়ান্ডার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের দাবি, এসব দেশের কোথাও সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এমপিদের নির্বাচনী এলাকা তদারকি বা সমন্বয়ের আইনি কর্তৃত্ব দেওয়া হয়নি।
আইন সংশোধনের প্রস্তাব
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, 'জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪' সংশোধন করে নতুন ২৬ক ধারা যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তাদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের এক বা একাধিক সাধারণ আসনে উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব দিতে পারবে। এ বিষয়ে স্পিকারকে অবহিত করতে হবে।
সম্প্রতি সরকার সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সাধারণ সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কাজ তদারকির দায়িত্ব দিয়েছে। এরই মধ্যে তারা বিভিন্ন সংসদীয় আসন পরিদর্শন ও সফর করেছেন। এতে মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এর আগের অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ, সংরক্ষিত আসনের এমপিদের এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্বাধীন দায়িত্ব পালনে হস্তক্ষেপের শামিল। এতে ক্ষমতার বিভাজন ব্যবস্থাও দুর্বল হবে বলে তারা মনে করেন।
