ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক শিক্ষকদের কার্যক্রম: নিয়ম আছে, প্রয়োগ নেই; ব্যর্থ ডিজিটাল মনিটরিংও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, একাডেমিক সহায়তা এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো 'হাউজ টিউটর' বা আবাসিক শিক্ষক ব্যবস্থা। তবে নীতিমালার দুর্বল প্রয়োগ, তদারকির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে অনেক হলেরই এই ব্যবস্থাটি এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি ছাত্র হলের শিক্ষার্থী, প্রাধ্যক্ষ (প্রোভোস্ট) এবং শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) বিভিন্ন হলের হাউজ টিউটরদের দায়িত্ব পালনে ব্যাপক অসঙ্গতি ও বড় ধরনের পার্থক্য খুঁজে পেয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতাপত্রে থাকা নিয়মনীতিগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এমনকি শিক্ষকদের কার্যক্রম তদারকি করতে ২০২৪ সালে চালু করা ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থাটিও এখন পুরোপুরি অচল।
প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই আবাসিক ব্যবস্থার অংশ হাউস টিউটর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই আবাসিক শিক্ষক ব্যবস্থাটি হলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ১৯১৭ সালের স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, হলগুলোকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম তার 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকার ইতিহাস (১৫৯৯-২০১২)' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কমিশন হলগুলোকে টিউটোরিয়াল এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুপারিশ করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হলের সঙ্গে যুক্ত থেকে নির্দিষ্ট একদল শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথা ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৮টি আবাসিক হলের জন্য মোট ২৬৮টি আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকের পদ রয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট হলের প্রাধ্যক্ষদের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। হাউজ টিউটরেরা ক্যাম্পাসে বিনা ভাড়ায় কোয়ার্টার সুবিধা পান, যার জন্য তাদের মূল বেতন থেকে একটি অংশ কাটা হয়। এছাড়া সহকারী হাউজ টিউটরেরা প্রতি মাসে ২,২০০ টাকা এবং হাউজ টিউটরেরা ৩,০০০ টাকা ভাতা ও বিদ্যুৎ বিলের সুবিধা পান। পাশাপাশি এই পদগুলো তাদের পেশাগত পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
নিয়ম আছে, প্রয়োগ নেই
২০২২ সালের আবাসিক হল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, হাউজ টিউটরদের সপ্তাহে অন্তত দুদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য নিজেদের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে। প্রতি সপ্তাহে নিজ নিজ তলা বা ব্লক পরিদর্শন করতে হবে এবং মাসে অন্তত একবার রাত ১০টার পর শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিতে হবে।
তাদের অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—কক্ষভিত্তিক শিক্ষার্থীদের তথ্য সংরক্ষণ করা, হলের সাধারণ পরিদর্শন, আসন বরাদ্দ তদারকি করা, ক্যানটিন ও স্পোর্টস কমিটিতে দায়িত্ব পালন এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের তদারকি করা।
তবে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, এই দায়িত্বগুলো খুব কম শিক্ষকই পালন করেন।
স্যার এ এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক হাবিব উল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, 'আমাদের হলে ছয়জন আবাসিক শিক্ষক থাকলেও প্রয়োজনে মাত্র একজনকে নিয়মিত পাওয়া যায়। প্রাধ্যক্ষকে বারবার জানানোর পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।'
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের জিএস খালেদ হোসেনের ধারণা, মাত্র ৩০ শতাংশ টিউটর নিয়মিত তাদের দায়িত্ব পালন করেন, আর বাকিরা শুধু অফিশিয়াল সভাগুলোতেই উপস্থিত থাকেন।
শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের মতে, আবাসিক শিক্ষকদের এই উদাসীনতার কারণে হলের খাবারের মান, আসন ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক প্রাধ্যক্ষ বলেন, কর্মচারী, হাউজ টিউটর এবং প্রাধ্যক্ষদের মধ্যে সমন্বয় বাড়লে শিক্ষার্থীদের সেবার মান অনেক উন্নত হতে পারে।
তবে এ এফ রহমান হলের হাউজ টিউটর ও সহকারী অধ্যাপক তানভীর নাহিদ খান বলেন, বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় শিক্ষকেরা হলের কাজে বেশি সময় দিতে পারেন না। তবে তিনি মনে করেন, অনেক শিক্ষকই হলের 'গণরুম' সমস্যা দূর করতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, 'অনেক হাউজ টিউটর সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু নেতিবাচক দিকগুলোই সবসময় বেশি ফোকাস করা হয়।'
ছাত্রী হলগুলোর চিত্র বেশ ইতিবাচক
ছাত্র হলের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি অনেক ভালো বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা। কবি সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাইশা মালিহা টিবিএস-কে বলেন, 'আমাদের হলের হাউজ টিউটররা দায়িত্ব ভাগ করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজ নিজ ফ্লোরে অবস্থান করেন। শিক্ষকদের সঙ্গে আমাদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে। কোনো সমস্যা হলে আমরা সেখানে জানালে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেন এবং রাতেও যেকোনো জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে পাশে থাকেন।'
কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সালমা নাসরিন বলেন, কাজের অতিরিক্ত চাপ থাকা সত্ত্বেও হাউজ টিউটরেরা প্রশাসনিক দায়িত্ব ভাগ করে সারাদিন নিজেদের ফ্লোরে দায়িত্ব পালন করেন। প্রয়োজনে রাত ১০টার পরও তারা জরুরি ডিউটি সম্পন্ন করেন।
দুই বছরেই মুখ থুবড়ে পড়েছে ডিজিটাল সফটওয়্যার
শিক্ষকদের হল পরিদর্শনের কাজ নিয়মিত তদারকি করতে ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন 'হাউজ টিউটর হল ভিজিট' নামের একটি বিশেষ সফটওয়্যার চালু করেছিল। এর মাধ্যমে শিক্ষকেরা হল পরিদর্শনের ছবি, ভিডিও ও তথ্য আপলোড করতেন, যা প্রাধ্যক্ষ ও প্রশাসন পর্যবেক্ষণ করতে পারত।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগটি সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩টি হল ও হোস্টেলের মধ্যে মাত্র একটি হল এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৪টি হল এবং ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ৪টি হল এটি ব্যবহার করেছিল। অর্থাৎ চালুর দুই বছরের মধ্যেই ডিজিটাল তদারকির এই উদ্যোগটি বন্ধ হয়ে যায়। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও নতুন প্রাধ্যক্ষ নিয়োগের কারণেও এটি বন্ধ হয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
অমর একুশে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, 'আমি এই সফটওয়্যারের কথা প্রথম শুনলাম। এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।'
একজন সাবেক হল প্রভোস্ট বলেন, টিউটরদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং আসন বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় সফটওয়্যারটি বেশ কার্যকর ছিল। তবে পরে এটি ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর সুবিধাগুলো আর পাওয়া যায়নি।
নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব
টিবিএস-এর সঙ্গে আলাপকালে বর্তমান ও সাবেক অন্তত তিনজন প্রাধ্যক্ষ জানান, আবাসন সংকটের এই ক্যাম্পাসে হাউজ টিউটর নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়শই শিক্ষকদের যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে প্রাধ্যক্ষদের পক্ষে কাজে অবহেলা করা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো সাংগঠনিক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম হাউজ টিউটর ব্যবস্থাটি পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, 'হাউজ টিউটররা কাজ করেন না, এমন ঢালাও কথা বলা যাবে না। কিছু শিক্ষক হয়তো দায়িত্ব এড়াতে পারেন, তবে বেশিরভাগই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং পুরো ব্যবস্থাটি সচল রয়েছে।'
বন্ধ হয়ে যাওয়া তদারকি সফটওয়্যারের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
'প্রতিষ্ঠার দর্শন থেকে অনেক দূরে সরে গেছি'
হাউস টিউটরিং ব্যবস্থার বর্তমান সংকটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন থেকে বিচ্যুতির ফল বলছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় যে দর্শন ছিল, আমরা সেখান থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। হল শুধু থাকার জায়গা নয়; এটি ছিল শিক্ষারও একটি অংশ। শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে সার্বক্ষণিক তদারকি করা আবাসিক শিক্ষকদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'হাউস টিউটর ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা রাজনৈতিকভাবে অকার্যকর করে দেওয়ার ফলেই গণরুম-গেস্টরুমের মতো সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। এখন যেহেতু টিউটরিং ব্যবস্থা আগের মতো কার্যকর নয়, তাই বিদ্যমান কাঠামোয় এই ব্যবস্থা আগের মতো রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।'
