আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা মার্কিন কোম্পানিগুলোর, চায় নীতির নিশ্চয়তা ও জ্বালানি নিরাপত্তা
বাংলাদেশে আরও পূর্বানুমানযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী নেতারা। নতুন মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সরকারি প্রচেষ্টার মধ্যে এ আহ্বান জানালেন তারা।
গতকাল (১১ আগস্ট) পৃথক দুটি বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসে। বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচেম) নির্বাহী কমিটি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে। অন্যদিকে, ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের (ইউএসবিবিসি) ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে বৈঠক করে।
অ্যামচেম সভাপতি ও মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল প্রধানমন্ত্রীকে জানান, সংগঠনটির সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। সরকার উপযুক্ত ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সম্ভব হতে পারে।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ব্যবসা সহজীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও নিরাপত্তা জোরদার এবং সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী অ্যামচেমের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংগঠনটির অবদানের স্বীকৃতি দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নেওয়ার পর সরকারের এখন অগ্রাধিকার হলো সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা, দক্ষ শাসন ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালী করা।"
তারেক রহমান সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে অ্যামচেমের সঙ্গে আরও গভীরভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের (ইউএসবিবিসি) প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশে বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথা তুলে ধরে এবং দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ইউএসবিবিসির সভাপতি ও ইউএস চেম্বার অব কমার্সের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অতুল কেশাপ।
কেশাপ বলেন, বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশটির অর্থনীতির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে এ উন্নয়নযাত্রায় মার্কিন কোম্পানিগুলো কীভাবে অংশীদার হতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা করেন।
অ্যামচেম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানায় অ্যামচেম।
অ্যামচেমের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
উভয় পক্ষই বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
অ্যামচেম ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের সংস্কার প্যাকেজকে স্বাগত জানিয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান, সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়ন, কর ও ভ্যাট প্রশাসন ডিজিটাল করা, কমপ্লায়েন্সের চাপ কমানো, মূলধন ও মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং শুল্ক প্রক্রিয়া সরলীকরণের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে সংগঠনটি।
সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত ও তা দূর করতে সরকার, ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অ্যামচেমের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি 'ডিজিটাল ইকোনমি অ্যাডভাইজরি ফোরাম' বা টাস্কফোর্স এবং একটি 'পাবলিক-প্রাইভেট কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল' গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছে অ্যামচেম।
সংগঠনটি বলেছে, এখন শুধু সংস্কার ঘোষণা নয়, বরং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পূর্বানুমানযোগ্য কর ও শুল্ক প্রশাসন, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারি-বেসরকারি সংলাপের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিনিয়োগসেবা সহজ করতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো এক জায়গায় আনতে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ' নামে একটি ওয়ান-স্টপ সেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। গত পাঁচ থেকে ছয় মাসে এ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থাগুলো সমন্বিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।
আলোচনায় জ্বালানি খাতেও গুরুত্ব দেয় উভয় পক্ষ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাবগুলো সরকার পর্যালোচনা করছে। দেশের জ্বালানি খাতকে বহুমুখী করা এবং সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি এ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি খাদ্যশস্য ও জ্বালানি সরবরাহ খাতে সরকারি এবং বেসরকারি—উভয় পর্যায়ে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান।
অন্যদিকে, অ্যামচেম শুধু বাজারে প্রবেশাধিকার নয়, এর বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বিস্তৃত কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশকে।
প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল উদ্ভাবন, ক্লাউড কম্পিউটিং ও সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনবিজ্ঞান (লাইফ সায়েন্স), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতের আধুনিকায়নকে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি।
