অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে নাজিরাবাজার মাতৃসদনে বন্ধ সিজারিয়ান সেবা, ৬ মাস ধরে নেই সরকারি ওষুধও
অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে রাজধানীর নাজিরাবাজার মাতৃসদনে দীর্ঘদিন ধরে সিজারিয়ান (সি-সেকশন) সেবা বন্ধ রয়েছে। এর ওপর গত ছয় মাস ধরে সরকারি ওষুধের কোনো সরবরাহ না থাকায় বহির্বিভাগের রোগীদের কোনো সাধারণ ওষুধও দিতে পারছে না হাসপাতালটি।
হাসপাতাল কর্মকর্তাদের মতে, এখানে চারজন মেডিকেল অফিসারের অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র দুজন নিয়োজিত আছেন। মহানগর শিশু হাসপাতাল থেকে সাময়িকভাবে প্রেষণে (ডেপুটেশন) আনা হয়েছে তৃতীয় আরেকজন চিকিৎসককে।
তবে সবচেয়ে বড় শূন্যতা রয়েছে অ্যানেসথেসিয়া কনসালট্যান্টের পদে। হাসপাতালে সাধারণ প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) কাজ চললেও, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের পদটি বছরের পর বছর ধরে খালি থাকায় সিজারিয়ানের প্রয়োজন হওয়া গর্ভবতী নারীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন পাঠানো হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি।
ওষুধের সঙ্কট
হাসপাতালটিতে ওষুধেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত প্রায় ছয় মাস ধরে এখানে কোনো সরকারি ওষুধ আসেনি। এর ফলে বহির্বিভাগে আসা রোগীদের কোনো ওষুধ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, গত বছর চালু হওয়া নবজাতক সেবা কার্যক্রমটিও (নিউবর্ন কেয়ার) এখন আর সচল নেই।
হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, 'প্রায় ছয় মাস ধরে সরকারি কোনো ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা রোগীদের একটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেটও দিতে পারছি না।' তিনি আরও জানান, অনেক রোগী ওষুধ ছাড়া শুধু প্রেসক্রিপশন নিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন, যার ফলে বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যাও কমে গেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, চরম কর্মী সংকটের কারণে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকদের বহির্বিভাগের চিকিৎসা, সাধারণ প্রসব এবং গাইনি সেবার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বাজেট ঘাটতি বলছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
এসব অভিযোগের জবাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, হাসপাতালটিতে ওষুধ এবং স্থায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তিনি বলেন, হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর (যিনি একজন গাইনোকোলজিস্ট) এবং অন্যান্য চিকিৎসকেরা নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। জটিল সি-সেকশন বা অন্যান্য জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য অন-কল ভিত্তিতে (জরুরি ডাক পেলে আসা) অ্যানেসথেসিয়া এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফি বিশেষজ্ঞদের আনা হয় এবং সরকারি তহবিল থেকে তাদের বিল পরিশোধ করা হয়।
ওষুধের সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সাধারণত অর্থবছরের শুরুতে হাসপাতালগুলো ওষুধ কেনে। কিন্তু গত অর্থবছরের শেষ নাগাদ বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে নতুন করে ওষুধ কেনা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে ওষুধ কেনার তহবিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বরাদ্দ পেলেই নতুন ওষুধ সরবরাহ করা হবে।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, হাসপাতালের পরিচালকেরা বাড়তি বাজেটের আবেদন না করায় কর্তৃপক্ষের পক্ষে অতিরিক্ত তহবিল অনুমোদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি গত অর্থবছরের কিছু বিলও বকেয়া রয়ে গেছে।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কর্মী সংকট দূর করতে সিটি কর্পোরেশন ইতিমধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং বেশ কয়েকটি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, 'বিশেষজ্ঞ পেশাদার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগে, তবে আমরা এই প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।'
ওষুধের সরবরাহের বিষয়ে তিনি জানান, আগে স্বাস্থ্য সেবায় সহায়তা দেওয়া বেশ কয়েকটি এনজিওর সাথে চুক্তির মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে এবং এরপর থেকে স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের দায়িত্ব নিয়েছে। সেবা কার্যক্রম স্বাধীনভাবে চলবে নাকি অন্য কোনো সংস্থার সহায়তা নেওয়া হবে, তা নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
