তালিকাভুক্ত অর্ধেক কোম্পানিতে নেই নারী স্বতন্ত্র পরিচালক, তৃতীয়বারের মতো সময় বাড়াল বিএসইসি
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অর্ধেক এখনো অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়নি, যদিও দুই বছরের বেশি সময় আগে এ শর্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
বিপুলসংখ্যক কোম্পানি এ নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তৃতীয়বারের মতো সময়সীমা বাড়িয়েছে।
সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগের ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেওয়া সময়সীমা আরও ছয় মাস বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্ধিত এ সময়সীমার মধ্যে নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিএসইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৮০টি নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। আরও ১৩১টি কোম্পানি অতিরিক্ত সময় চেয়েছে বা এখনো নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি। আর বাকি কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তাদের পরিপালনসংক্রান্ত অবস্থার তথ্য জমা দেয়নি। ফলে ১৮০টি কোম্পানি এখনো এ শর্ত পুরোপুরি পরিপালনের বাইরে রয়েছে।
২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল সরকারি গেজেটে প্রকাশিত করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়।
বিএসইসির কর্মকর্তারা বলছেন, এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিত করা নয়, বরং করপোরেট সুশাসন আরও শক্তিশালী করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, পরিচালনা পর্ষদে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বৈচিত্র্য আসবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং স্বতন্ত্র পরিচালকেরা তাদের তদারকির দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে পালন করতে পারবেন।
এ লক্ষ্যে ব্যবসায়ী, করপোরেট নির্বাহী, বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ অন্যান্য পেশাজীবীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের যোগ্য নারীদের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করেছে কমিশন।
তবে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির দাবি, বাস্তবে এ শর্ত পরিপালন এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং।
এর আগে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) কমিশনকে জানিয়েছিল, যোগ্য নারী স্বতন্ত্র পরিচালক খুঁজে পাওয়া অনেক কোম্পানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এমন বিদ্যমান বিধান সম্ভাব্য প্রার্থীর পরিসর আরও সীমিত করেছে।
কোম্পানির প্রতিনিধিরা আরও বলছেন, সময়ের দায়বদ্ধতা, আইনগত দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত বিবেচনায় অনেক অভিজ্ঞ ও যোগ্য নারী পরিচালনা পর্ষদের পদ গ্রহণে অনাগ্রহ দেখান।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বিএপিএলসির সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় অর্ধেক ইতোমধ্যে এ শর্ত পরিপালন করেছে। তবে বাকি কোম্পানিগুলোর আরও সময় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, "বিএসইসি সময়সীমা বাড়িয়েছে, যা কোম্পানিগুলোর জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ।"
তিনি আরও বলেন, কোম্পানিগুলো শর্ত পরিপালনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করেন—এমন উপযুক্ত প্রার্থী শনাক্ত করতে পারলে বাকি কোম্পানিগুলোও এ শর্ত পূরণ করবে।
রিয়াদ মাহমুদ আরও জানান, করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকের ন্যূনতম সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, "আগে কোম্পানিগুলোর জন্য দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী এ সংখ্যা বাড়িয়ে তিনজন করা হবে। এটি বাস্তবায়ন খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে বলে আমাদের সংগঠন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে।"
অন্যদিকে করপোরেট সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যোগ্য নারী পেশাজীবীর অভাব নেই। তাদের মতে, ব্যাংক, বিমা, বিশ্ববিদ্যালয়, আইন পেশা, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি, জনপ্রশাসন ও করপোরেট খাতে বহু অভিজ্ঞ নারী রয়েছেন, যাঁরা স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।
তাদের মতে, অগ্রগতি ধীর হওয়ার মূল কারণ যোগ্য প্রার্থীর সংকট নয়; বরং অনেক পরিবারনিয়ন্ত্রিত কোম্পানি তাদের পরিচালনা পর্ষদে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন মতামতধারী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে চায় না।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিচালনা পর্ষদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা শুধু কোনো নিয়ন্ত্রক শর্ত পরিপালনের বিষয় নয়; এটি সুশাসনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নীতি। অধিক বৈচিত্র্যময় পরিচালনা পর্ষদ শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উন্নত কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বেশি জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার আশা, বর্ধিত সময়সীমা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চলমান আলোচনা ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। এর ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে করপোরেট সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে।
