চট্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো নলকূপ ও শৌচাগার, বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার নলকূপ এবং ৫ হাজার ৬৯৪টি শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এসব এলাকায় পানিবাহিত ও চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সংকটের মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই তিন উপজেলায় ১৯ হাজার ৯৬১টি নলকূপ নষ্ট হয়েছে। এছাড়া জেলার ৮১টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দ্রুত বিকল্প নিরাপদ পানির সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য নজরদারি জোরদার না করলে ডায়রিয়া, কলেরা ও চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া টিবিএসকে বলেন, "শুধু পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে হবে না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দ্রুত বিকল্প উপায়ে বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বন্যায় যেসব শৌচাগার নষ্ট হয়েছে, সেগুলোর পরিবর্তে দ্রুত স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ল্যাট্রিন সরবরাহ করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "সরকারি হিসাবেই প্রায় ২০ হাজার নলকূপ ও প্রায় ৬ হাজার শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব নলকূপ ও শৌচাগারের ব্যবহারকারীরা সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে।"
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে বন্যায় মোট ৮১টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১টি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়ায়। এ ছাড়া বাঁশখালীতে ১৭টি, চন্দনাইশ ও আনোয়ারায় ৬টি করে, লোহাগাড়ায় ৫টি, ফটিকছড়ি ও সন্দ্বীপে ৪টি করে, রাউজান ও সীতাকুণ্ডে ৩টি করে এবং কর্ণফুলীতে ২টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপগুলোর মধ্যে ১২ হাজার ১১০টি সম্পূর্ণ এবং ৭ হাজার ৮৫১টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণ অকেজো নলকূপ পুনঃস্থাপনে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ সংস্কারে আরও প্রায় ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২৩টি সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। পাশাপাশি ২ হাজার ৪৭২টি শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নে ৭ হাজার ১২৭টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৫টি সম্পূর্ণ এবং ২ হাজার ১১২টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এ ছাড়া উপজেলাটিতে ২ হাজার ১৫৬টি শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে চন্দনাইশের আটটি ইউনিয়নে ৪ হাজার ৮০৮টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৭২টি সম্পূর্ণ এবং ২ হাজার ২৩৬টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। উপজেলাটিতে ১ হাজার ৬৬টি শৌচাগারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ডিপিএইচইর চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস টিবিএসকে বলেন, "বন্যা-পরবর্তী সময়ে নিরাপদ সুপেয় পানি নিশ্চিত করা এবং পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধই এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ইতোমধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় ৬ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষ যেন ট্যাবলেটগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করে নিরাপদ পানি পান করতে পারে, সে বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপের তালিকা ও প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত মেরামত ও পুনর্বাসনকাজ শুরু করা হবে।"
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নতুন নলকূপের ভিত্তি উঁচু করে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বন্যার সময় নলকূপের মাথা পানির নিচে চলে গেলে কাদা ও পলি ঢুকে অনেক ক্ষেত্রে তা স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে পড়ে। উঁচু প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করা হলে এ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
এদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১১২টি মেডিকেল ক্যাম্প ও ৩২টি মোবাইল মেডিকেল টিমের মাধ্যমে ৪৫ হাজার ২০০ জন বন্যাদুর্গত মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ৭৭ হাজার ৫০০ প্যাকেট ওআরএস, ৬৫ হাজার ৯০০টি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ৮৫ হাজার ১০০টি প্যারাসিটামল এবং ২৩ হাজার ৭৫০টি হিস্টাসিন ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাপে কাটা ১১৮ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে এবং জেলার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮০০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় উপজেলার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে উপজেলার ৪০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ১৬টি এবং একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র পানিতে ডুবে যায়। ফলে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
বন্যাকালীন ও পরবর্তী সময়ে উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ১৫টি মোবাইল মেডিকেল টিম গঠন করা হয়। চিকিৎসক, স্বাস্থ্য সহকারী ও কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি) নৌকায় করে দুর্গত মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। এ ছাড়া আটটি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে ৫ হাজারের বেশি মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজমা আক্তার টিবিএসকে বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে আসা রোগীদের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই চর্মরোগে আক্রান্ত। ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। তবে ওরস্যালাইন বিতরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, বন্যার পর সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ২২ থেকে ২৪ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অমিত দে বলেন, বন্যাকালীন ও পরবর্তী সময়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও আশ্রয়কেন্দ্রে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার মানুষই বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত।
দীর্ঘ সময় বন্যার পানিতে থাকার কারণে মানুষের হাত-পায়ে গভীর ছত্রাকজনিত সংক্রমণসহ বিভিন্ন ত্বকের রোগ বেড়েছে। এসব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ২৬টি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়েছে। নৌকাযোগে মোবাইল মেডিকেল টিম দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধও সরবরাহ করা হয়েছে।
ডা. অমিত দে জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন ডায়রিয়া রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এ ছাড়া ১১ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম, প্রায় ১ হাজার ভায়াল কলেরা স্যালাইন, ১০ হাজার প্যাকেট ওআরএস এবং ৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুত রয়েছে। ইতোমধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে ৮ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, বন্যার শুরু থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা সচল রাখা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার পাশাপাশি মাঠকর্মীরাও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন।
বন্যার সময় বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে তিন থেকে চারজন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি রয়েছেন। তবে দূষিত পানির কারণে চর্মরোগের প্রকোপ কিছুটা বেড়েছে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন চর্মরোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যাও আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেশমী চাকমা টিবিএসকে বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, "ইতোমধ্যে ৮ হাজারের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে।"
স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যার পানি নেমে গেলেও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং চর্মরোগের প্রকোপ এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ দ্রুত মেরামত, নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত এবং মেডিকেল ক্যাম্পের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
