হাইকোর্টের রায় বহাল, সংবিধানে ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট ব্যবস্থা
বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচজন বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে, গতকাল বুধবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়। টানা তিন দিন শুনানি শেষে রায়ের জন্য আজ দিন ধার্য করা হয়।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, "হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে রায় ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগ। ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকছে।"
তিনি বলেন, "হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় বহাল। অর্থাৎ সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, গণভোট পুনর্বহাল এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষমতা একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের কাছেই থাকবে বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন; সেগুলো বহাল থাকলো।"
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "এছাড়াও হাইকোর্ট রায়ে বলেছিলেন, 'পঞ্চদশ সংশোধনীতে অন্যান্য যত পরিবর্তন আনা হয়েছিল সেই বিষয়ে জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নিবে।' এটিও বহাল থাকলো।"
তিনি বলেন, "রায়ের ফলে সংবিধানে ফিরলো গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।"
আপিল বিভাগ বলেছেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা বাকি পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এখন জাতীয় সংসদের।
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পাস হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। একই বছরের ৩ জুলাই এতে রাষ্ট্রপতির সম্মতি মেলে।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল করা হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃস্থাপন করা হয়।
এছাড়া অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়। সংসদ নির্বাচনের সময়সূচিও পরিবর্তন করে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই বছরের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চান, কেন এ সংশোধনীকে সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না।
পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণফোরাম এবং আরও কয়েকজন ব্যক্তি ও সংগঠন মামলায় বাদি হন। মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও পৃথক একটি রিট করেন।
শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত বিধান, সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ, মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত ৪৪(২) অনুচ্ছেদ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটসংক্রান্ত বিধান বাতিলের অংশসহ কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণা করেন।
এরপর বদিউল আলম মজুমদার ও অন্যরা, মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং মিয়া গোলাম পরওয়ার আপিলের অনুমতি চান। তাদের আইনজীবীরা আপিল বিভাগে যুক্তি দেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করা উচিত।
আজকের রায়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। এর ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ দেওয়া সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিধান পুনর্বহাল হলো।
