সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন, ৭ বছরেও শেষ হয়নি ৮৮১ কোটি টাকার ঢাকা আপগ্রেডিং প্রকল্প
ঢাকার সবচেয়ে অবহেলিত ও ঘনবসতিপূর্ণ কয়েকটি এলাকার জীবনমান উন্নয়নে ২০১৯ সালে নেওয়া ৮৮০ কোটি ৬৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প ৭ বছরেও শেষ হয়নি।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। পরে বারবার নকশা সংশোধন, জমি হস্তান্তরে বিলম্ব, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রকল্প এলাকায় অসম অগ্রগতির কারণে দুই দফা সময় বাড়ানোর পরও শেষ করা যায়নি কাজ।
নগরসেবা ও পরিবেশগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, সূত্রাপুর-নবাবগঞ্জ-গুলিস্তান এবং খিলগাঁও-মুগদা-বাসাবো এলাকায় সড়ক, নালা, ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ ও কমিউনিটি সেন্টার উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়।
আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে বাধ্যতামূলক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও এ প্রকল্পে তা করা হয়নি। এটিকে প্রকল্পটির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে ভূমি জরিপ, মৃত্তিকা পরীক্ষা ও হাইড্রোলজিক্যাল স্টাডিসহ পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
২০১৯ সালের মার্চে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৮০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ছিল মার্চ ২০১৯ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় ৩৭৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা কমিয়ে বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৮ কোটি ১ লাখ টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ৪৬৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, প্রকল্পের ব্যয় ৪২ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমলেও মেয়াদ বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। রাস্তা, ড্রেন ও খেলার মাঠের কাজে কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও প্রাথমিক পরিকল্পনার ঘাটতি, নকশাগত জটিলতা, এলাকাভিত্তিক অসম অগ্রগতি এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখনো প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা হয়ে আছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্পের অগ্রগতি, কাজের মান, দুর্বলতা, ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা মূল্যায়নে এ সমীক্ষা করা হয়।
গত মে পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭২ শতাংশ। একই সময়ে আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৮০ শতাংশে। প্রকল্পের আওতায় ৯টি নতুন কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, একাধিক সড়ক ও ড্রেন সংস্কার, ফুটপাত ও খেলার মাঠ উন্নয়ন, পুকুর সংস্কার এবং বর্জ্য স্থানান্তর স্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে।
তবে আইএমইডি বলছে, কিছু খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও স্ট্রিট লাইট, ট্রাফিক সাইন ও বৃক্ষরোপণের মতো খাতে আর্থিক অগ্রগতি খুবই কম। এসব খাতে অগ্রগতি যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং প্রায় ২ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইট হস্তান্তরে বিলম্ব। নতুন কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের জন্য পুরোনো অবকাঠামো নিলামের মাধ্যমে ভেঙে ঠিকাদারকে সাইট বুঝিয়ে দিতেই আট মাস সময় লেগেছে।
নওলাগোলা কমিউনিটি সেন্টারের ক্ষেত্রে জমি নিয়ে সামাজিক জটিলতা তৈরি হওয়ায় ভবনের নিচতলা জনসাধারণের চলাচলের রাস্তার জন্য ছেড়ে দিতে হয়েছে। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্প গ্রহণের সময় কোনো কারিগরি সমীক্ষা না হওয়ায় এ ধরনের বাস্তব জটিলতা আগেভাগে চিহ্নিত করা যায়নি।
সরেজমিন পরিদর্শনেও একাধিক নকশাগত অসংগতি পেয়েছে আইএমইডি। নওলাগোলা কমিউনিটি সেন্টারের তৃতীয় তলায় লাইব্রেরি ও ফিশ শপের জন্য জায়গা রাখা হলেও সেখানে কোনো টয়লেটের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
মহানগর নাট্যমঞ্চের নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার জানিয়েছেন, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, সিলিং, এসি ও সাউন্ড সিস্টেম মূল প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এ ছাড়া স্ট্রিট লাইটে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে বিদ্যুৎচালিত এলইডি বাতি বসানো হয়েছে। বৃক্ষরোপণে প্রজাতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বন বিভাগের মতামত নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি।
প্রকল্পের ৯ অর্থবছরের মধ্যে ৬ অর্থবছরে মোট ২৫টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর বড় একটি অংশ এখনো অনিষ্পন্ন। এসব আপত্তির সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ ১৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনাতেও একাধিক দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। নির্ধারিত ১৮টি পিআইসি ও ১৮টি পিএসসি সভার বিপরীতে যথাক্রমে মাত্র ৭টি এবং ৪টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শতকরা হিসাবে যা যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও ২২ দশমিক ২২ শতাংশ।
অনুমোদিত ২৮টি পদের বিপরীতে ৭টি পদ এখনো শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পদও রয়েছে।
আইএমইডির এসডব্লিউওটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পের শক্তির জায়গা ছিল যথাসময়ে পর্যাপ্ত অর্থের যোগান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহায়তা। তবে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়নকালে একাধিকবার নকশা পরিবর্তন, চার এলাকায় কাজের অসম বণ্টন, অনিয়মিত পিআইসি-পিএসসি সভা এবং সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ল্যাব না থাকাকে প্রকল্পের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) সুস্পষ্ট এক্সিট প্ল্যান ছিল না। আইএমইডি বলেছে, ভবিষ্যতের সব উন্নয়ন প্রকল্পে শুরু থেকেই বাধ্যতামূলক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, সুস্পষ্ট এক্সিট প্ল্যান এবং শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি সংশোধিত মেয়াদের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, ধীরগতির কাজগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন, অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি এবং প্রকল্প পরিচালনায় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান টিবিএসকে বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া এ ধরনের বড় প্রকল্প নেওয়াই ছিল মূল সমস্যা।
তিনি বলেন, "নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্পে প্রতিটি এলাকার চাহিদা আলাদা হলেও এলাকাভিত্তিক মূল্যায়ন বা কমিউনিটির মতামত নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকল্পের অনেক উপাদান স্থানীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।"
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনা কমিশন ও সিটি করপোরেশন—উভয়েরই এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি রয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে বাধ্যতামূলক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, কমিউনিটি সম্পৃক্ততা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্পের পরিচালক রাজিব খাদেম টিবিএসকে বলেন, তিনি গত ৫ আগস্ট থেকে প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছেন। আগের সব বিষয়ে সরাসরি অবগত না থাকলেও প্রকল্পের নথিপত্র অনুযায়ী কোনো বড় প্রকল্প যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া অনুমোদন পায় না।
তার দাবি, প্রকল্পটির শুরুতে নিয়ম অনুযায়ী প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছিল এবং পরবর্তী ধাপের প্রয়োজনীয় সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রকল্পটি অনুমোদন ও অর্থায়ন পেয়েছে। তাই প্রকল্পটি কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই নেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
তবে আইএমইডিকে প্রকল্প পরিচালক জানান, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া ও কনসালটেন্সি প্যাকেজ অনুমোদনে বিলম্ব, জনবল সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন শর্তের কারণে অর্থছাড় ও অনুমোদনে দেরি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশ পরামর্শকসহ কয়েকটি কনসালটেন্সি প্যাকেজের অনুমোদন না পাওয়ায় কাজে ধীরগতি এসেছে।
প্রায় প্রতিটি প্যাকেজে বিওকিউ পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজারদরের ওঠানামা, বাস্তব প্রয়োজনে নকশা পরিবর্তন এবং কাজের পরিধি বাড়া-কমার কারণে এসব পরিবর্তন করতে হয়েছে।
বর্তমান অগ্রগতির নিরিখে বাকি কাজ শেষ করতে কত সময় লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। কিছু কাজ হয়তো পরবর্তী কোনো প্রকল্পের মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হবে।
