সার্ক ও বিমসটেকের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই: শামা ওবায়েদ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ক ও বহুখাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য বঙ্গোপসাগরীয় উদ্যোগ—বিমসটেকের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ দুটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, বরং পরিপূরক সম্পর্ক থাকা উচিত।
সোমবার (৬ জুলাই) এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সার্ক এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে বিমসটেকের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে এ কথা বলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়াকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে। অন্যদিকে, সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে বিমসটেকের বাইরে থাকা দেশগুলোও অন্তর্ভুক্ত।
তিনি বলেন, উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো যেন সার্কের গতি কমিয়ে না দেয়; বরং এগুলোকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ একইসঙ্গে সার্ক এবং বিমসটেককে সমর্থন করতে পারে। কারণ, যোগাযোগ, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে উভয় প্ল্যাটফর্মই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা এবং সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো তারিক এ করিম।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব (সার্ক ও বিমসটেক) এবং কোডারসট্রাস্ট বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুল হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত ও সমাপনী বক্তব্য দেন।
মূল প্রবন্ধে মানচিত্র নিয়ে আপত্তি
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় প্রদর্শিত একটি মানচিত্র নিয়ে আপত্তি জানান ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা।
তিনি বলেন, এখানে ভারতের যে মানচিত্র দেখানো হয়েছে, তা সঠিক নয়। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই উপস্থাপিত মানচিত্রটি সঠিক নয় বলে আমি মনে করি।
জবাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম বলেন, মানচিত্রটি শুধু উপস্থাপনার সুবিধার্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এটি প্রকৃত সীমারেখা নির্দেশ করে না।
পরে পূজা কুমারী ঝা বলেন, আমি বুঝতে পারছি, স্যার। কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরকে আমরা ভারতের অংশ হিসেবে দেখি এবং এখানে সেটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই বিষয়টি শুধু উল্লেখ করতে চেয়েছি।
এর জবাবে তারিক করিম বলেন, বিষয়টি নথিভুক্ত করা হলো।
'সর্বোচ্চ কার্যকর অবস্থায়' সার্ক পরিচালনার আহ্বান
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার প্রাথমিক ধাপে বাংলাদেশ চায়, পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটি 'সর্বোচ্চ কার্যকর অবস্থায়' পরিচালিত হোক।
তিনি বলেন, 'সর্বোচ্চ কার্যকর অবস্থায়' কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ শুধু প্রতীকীভাবে সার্ককে টিকিয়ে রাখা নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মতভাবে যতটুকু সম্ভব, তার সর্বোচ্চটা করা। অর্থাৎ লক্ষ্য হবে উচ্চাভিলাষী, কিন্তু পদ্ধতি হবে বাস্তবভিত্তিক।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কার্যকর সার্কের বৈশিষ্ট্য হবে নিয়মিত কারিগরি ও কর্মকর্তাপর্যায়ের বৈঠক, পূর্বনির্ধারিত কর্মকাণ্ডের ক্যালেন্ডার, শক্তিশালী বিশেষায়িত সংস্থা ও আঞ্চলিক কেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জন্য দৃশ্যমান ফলাফল।
তার মতে, সব সদস্য রাষ্ট্র একই সময়ে প্রতিটি উদ্যোগে অংশ নিতে প্রস্তুত নাও থাকতে পারে। তাই আগ্রহী সদস্যদের মধ্যে প্রকল্পভিত্তিক নমনীয় সহযোগিতার সুযোগ রাখতে হবে। তিনি বলেন, 'কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র যদি কোনো বিষয়ে সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে অন্যদের জন্য দরজা খোলা রেখে তাদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।'
শামা ওবায়েদ বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সার্কভুক্ত সব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেছেন এবং সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে তাদের ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করেছেন।
তিনি বলেন, 'এখন আমাদের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। সদিচ্ছাকে কার্যকর পদক্ষেপে পরিণত করতে হবে।'
অন্তর্ভুক্তিমূলক দক্ষিণ এশিয়ার ওপর গুরুত্বারোপ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্কের উদ্দেশ্য কোনো দুই দেশকে রাজনৈতিক সংলাপে বাধ্য করা নয়; বরং দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা যাতে পুরো আঞ্চলিক সহযোগিতা ব্যবস্থাকে অচল না করে, তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে সার্ককে অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে থাকতে হবে। 'তাই সব সদস্য দেশের জন্য দরজা খোলা রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে সম্মত কারিগরি ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।'
শামা ওবায়েদ বলেন, সার্ক এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ছোট দেশগুলো সম্মিলিতভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারে; ভারত গঠনমূলক আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে পারে; পাকিস্তান বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে এবং রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি না হলেও অভিন্ন নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, সার্ক নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আশাবাদী এবং বাস্তবসম্মত। আমরা আশাবাদী, একই সঙ্গে বাস্তববাদীও। আমরা মনে করি না যে সার্ক রাতারাতি পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাভাবিকতায় ফিরে যাবে। আবার এটাও মানি না যে কিছুই করা সম্ভব নয়। বাস্তবসম্মত, কারিগরি এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করলে অনেক কিছুই করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ হলো প্রতিষ্ঠানটিকে সংরক্ষণ করা; যা এখনও কার্যকর রয়েছে, তা আরও শক্তিশালী করা, দুর্বল দিকগুলো সংস্কার এবং যেখানে ঐকমত্য সম্ভব সেখানে সহযোগিতা গড়ে তোলা। এভাবেই পারস্পরিক আস্থা ফিরে আসতে পারে বলে মত তার।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্ক এখন বিচক্ষণ নেতৃত্ব, বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা এবং নতুন আস্থার অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশ সেই আস্থা তৈরিতে অবদান রাখতে প্রস্তুত।
কার্যকর সার্কের জন্য প্রয়োজন দুটি বিষয়
কার্যকর সার্ক নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তারিক এ করিম বলেন, আপনার কাছে একটি ইঞ্জিন আছে, কিন্তু রাজনীতি কার্যকর না হলে সেই ইঞ্জিন চলবে না। এটাই অন্যতম সমস্যা। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, ইঞ্জিন চালু হলেও সেটি কতদূর চলবে, তা নির্ভর করবে আপনার কাছে কতটা জ্বালানি আছে তার ওপর।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, কার্যকর সার্কের জন্য দুটি বিষয় প্রয়োজন। প্রথমত, রাজনীতিকে এমন পর্যায়ে যেতে হবে, যেখানে তা যৌক্তিকভাবে কাজ করবে এবং বারবার ব্যর্থ হবে না। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে হলে প্রয়োজনীয় জ্বালানি থাকতে হবে। সার্কেরও সেটিই প্রয়োজন। আমাদের কাছে একটি চমৎকার গাড়ির ধারণা রয়েছে, কিন্তু রাজনীতি কীভাবে ইঞ্জিন চালু করবে এবং সেই গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আছে কি না, সেটিই এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা ও প্যানেল আলোচনার পর একটি উন্মুক্ত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা সার্কের কার্যকারিতা সীমিত করে রাখা কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও কার্যকর সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী এবং নীতিনির্ধারণ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
