হাম থেকে সেরে ওঠার পর চোখের জটিলতায় ভুগছেন অনেকে
হাম থেকে সেরে ওঠার পরও অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের চোখে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। কর্নিয়ায় সাদা দাগ, ঝাপসা দেখা, চোখ লাল হওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ নিয়ে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন।
সময়মতো চিকিৎসা না হলে কর্নিয়ায় আলসার, এমনকি কর্নিয়া ছিদ্র হয়ে স্থায়ী দৃষ্টিহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে হাম থেকে সেরে ওঠার পর চোখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ভিশন আই ভিশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. মো. মাসুদুল হাসান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এখন পর্যন্ত আমার চেম্বারে হাম-সম্পর্কিত চোখের জটিলতা নিয়ে প্রায় ১০০ রোগী এসেছেন। তাদের মধ্যে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—দুই ধরনের রোগীই রয়েছেন।"
তিনি বলেন, সম্প্রতি তিন বছর বয়সী এক শিশুর এক চোখের কর্নিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিশুটি ভিটামিন 'এ'-এর তীব্র ঘাটতিজনিত কেরাটোম্যালেশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এতে তার এক চোখের কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। উপযুক্ত কর্নিয়া পাওয়া গেলে তার কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হবে। তবে বাংলাদেশে কর্নিয়া দানের হার কম হওয়ায় প্রয়োজনীয় কর্নিয়া পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
ডা. মাসুদুল হাসান বলেন, হামের সঙ্গে ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল দেওয়া হয়, যাতে কর্নিয়ার মারাত্মক ক্ষতি প্রতিরোধ করা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত হাম ও সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ২৫০ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৮৫ হাজার ১২২ জন।
ডা. মাসুদুল হাসান বলেন, হাম থেকে সেরে ওঠার পরও চোখের জটিলতা দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি এক চিকিৎসক নিজেও হাম থেকে সেরে ওঠার পর ঝাপসা দেখার সমস্যা নিয়ে তার কাছে আসেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, তার কর্নিয়ায় সাদা দাগ তৈরি হয়েছে, যা হাম-পরবর্তী কর্নিয়ার জটিলতার লক্ষণ।
তিনি বলেন, হাম-পরবর্তী চোখের জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের সাধারণত কর্নিয়ায় সাদা দাগ, ঝাপসা দেখা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং কনজাংকটিভাইটিসের মতো উপসর্গ দেখা যায়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "হাম থেকে সেরে ওঠার পর একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ দিয়ে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। এতে প্রাথমিক পর্যায়েই জটিলতা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে এবং স্থায়ী দৃষ্টিহানি এড়ানো যাবে।"
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. বজলুল বারী ভূঁইয়া বলেন, হামের সঙ্গে কনজাংকটিভাইটিস ও কর্নিয়ার জটিলতার সম্পর্ক রয়েছে। ভিটামিন 'এ'-এর ঘাটতিতে আক্রান্ত শিশুদের কর্নিয়ার গুরুতর সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। হামে আক্রান্ত হয়ে কনজাংকটিভাইটিস ও কর্নিয়া-সম্পর্কিত জটিলতা নিয়ে অনেক রোগী হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর পুষ্টিগত অবস্থা ভালো থাকলে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে হামজনিত চোখের সংক্রমণ ধীরে ধীরে সেরে যায়। তবে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, তাদের ঝুঁকি বেশি।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটেও হামজনিত চোখের সমস্যা নিয়ে রোগীরা আসছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ এস এম কাদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত সব শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ককে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন 'এ' সাপ্লিমেন্টের দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। এতে শরীরে ভিটামিন 'এ'-এর ঘাটতি পূরণ হয়, চোখের ক্ষতি ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং হামজনিত মৃত্যুঝুঁকি কমায়।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর শরীরে ভিটামিন 'এ'-এর মাত্রা কমে যায়। এর ফলে চোখ শুকিয়ে যেতে পারে এবং চোখের ক্ষতি হতে পারে।
তিনিও তার ব্যক্তিগত চেম্বারে হাম থেকে সেরে ওঠার পর চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে—এমন রোগী পেয়েছেন বলে জানান।
এদিকে, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আরও অবনতি হচ্ছে। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩৮ এ।
