জুনে মব সহিংসতায় নিহত ৩১, নির্যাতনের শিকার ৩৫২ নারী-কন্যা শিশু: এইচআরএসএস
চলতি বছরের জুন মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জুন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে এসব তথ্য জানায় মানবাধিকার সংগঠনটি।
গত মে মাসের তুলনায় জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন।
জুন মাসের রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তারিত পরিসংখ্যানে এইচআরএসএস জানায়, এ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ২১টি ঘটনাই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে। আর এতে নিহত হয়েছেন ৩ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৬ জন।
এছাড়া বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৮টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৬ জন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ১১৫ জন।
বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৮ জন; বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯ জন; বিভিন্ন দলের মধ্যে ৫টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ২২ জন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন, শিবিরের ১ জন, ইউপিডিএফের ১ জন এবং ১ জন চরমপন্থী দলের সদস্য রয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৬৩টি গণপিটুনী ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৯ জন।
এছাড়া এ মাসে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন, অভিযানে, আসামি ছিনতাই ও স্থানীয় জনগণের মব সহিংসতায় সারাদেশে অন্তত ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন আইন শৃঙ্খলাবহিনীর সদস্য আহত ও হামলার শিকার হয়েছেন।
জুন মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, এ মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৮ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৫ জন এবং হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৯ জন সাংবাদিক। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এ মাসে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামি মারা গেছেন জানিয়ে এইচআরএসএস জানায়, এর মধ্যে ৪ জন জন কয়েদী এবং ৩ জন হাজতী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন, বিএনপির একজন এবং ৫ জন জন্য সাধারণ কয়েদী রয়েছেন।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১২টি হামলার ঘটনায় ৭ জন আহত হয়েছে। এছাড়া ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলেও জানানো হয়।
জুন মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ১০৬ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৫ (৭১%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ১৯ জন নারী ও কন্যা শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর ২ জন কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ৯৪ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এদের মধ্যে শিশু ৪৯ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৪, আহত ৪ এবং আত্মহত্যা করেছেন ২ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৫৭ জন, আহত হয়েছেন ৪৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩৬ জন নারী। এছাড়া, এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন নারী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ মাসে ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৩৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, 'এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে।'
