কমছে না হামের প্রকোপ, বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ
হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশে এখনো এ রোগের প্রকোপ কমেনি। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার শিশু হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং প্রায় প্রতিদিনই হামে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এরই মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও এতে মৃত্যুর হার বাড়তে থাকায় দেশের জনস্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ডেঙ্গুর বাড়তি চাপ মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করার পাশাপাশি হামের টিকার আওতা বাড়ানো এবং এভিডেন্সবেইজড (প্রমাণনির্ভর) মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৮ জন। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই মারা গেছেন ১৩ জন। মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৬ হাজার ৪ জন। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৯০৭ জন।
ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে বরিশাল বিভাগে, সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১,৬২৯ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১,১৪০ জন এবং খুলনা বিভাগে ৭০১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। সেখানে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৭১ জন, আর উত্তর সিটি করপোরেশনে ভর্তি হয়েছেন ৫৩২ জন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, এখন থেকে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'এবার ঢাকার তুলনায় ঢাকার বাইরেই সংক্রমণ বেশি হবে। কিন্তু সেসব এলাকার রোগীরা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসায় পথে তাদের অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ে।'
তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ সময় যাতায়াতের কারণে ডেঙ্গু রোগীদের ডিহাইড্রেশন ও প্লাজমা লিকেজ হতে পারে। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটে আসতে না হয়।
ফগিংকে অকার্যকর উল্লেখ করে তিনি বলেন, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে এভিডেন্সবেইজড, লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে লার্ভা ধ্বংস করাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য।
এছাড়া মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। জেলার হাসপাতালগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
টিকাদানের ঘাটতিতে দীর্ঘায়িত হচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাব
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৭১৮ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত টিকাদান কভারেজের অভাবই হামের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রধান কারণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, হামের সংক্রমণ থামাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলোতে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিরও পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা হয়নি। ফলে অনেক অভিভাবকই এ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে পারেননি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি এবং কম সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ তথ্য যথাযথভাবে পৌঁছায়নি।
তিনি বলেন, 'প্রতিদিন যদি প্রায় এক হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাহলে প্রতিদিনই মৃত্যুর ঝুঁকি থাকবে। মৃত্যু ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।'
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, এখন ডেঙ্গুর মূল মৌসুম শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতেও সংক্রমণ বাড়বে। তাই সারা দেশে সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ডেঙ্গু চিকিৎসাসেবা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ অনেক রোগীরই চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে আসার সামর্থ্য নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হসেন বলেন, শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এখন নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, 'যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দ্বিতীয় ডোজও নিশ্চিত করতে হবে।'
