মাদক মামলার জট নিরসনে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সারাদেশে বিচারাধীন প্রায় ৮০ হাজার মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) আন্তর্জাতিক মাদক অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৮০ হাজার মাদক মামলা ঝুলে রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার এবং চট্টগ্রামে প্রায় ৩৯ হাজার মামলা।'
মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের আধুনিক অস্ত্র, ডগ স্কোয়াড, নিজস্ব আটক কেন্দ্র এবং উন্নত পরিবহন সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক গ্রহণ করছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'এটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। নতুন ধরনের সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের ক্রমবর্ধমান বিস্তার মাদক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ কারণে সরকার মাদকনির্ভর ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা জোরদার ও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান আইনটি মাদক সংক্রান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলায় আর যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, 'অনেক মাদক চোরাকারবারি সশস্ত্র গ্রুপ পরিচালনা করে, অথচ অভিযান পরিচালনাকারী ডিএনসি পরিদর্শকদের কাছে কোনো অস্ত্র থাকে না। এটি তাদের কোনো প্রকার সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই মাঠে পাঠানোর মতো।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশে মাদক পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি নেই। ফলে জব্দকৃত মাদক পরীক্ষা এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া গ্রেপ্তারকৃত মাদক চোরাকারবারিদের থানায় হস্তান্তরের আগে সাময়িকভাবে আটকে রাখার জন্য ডিএনসির নিজস্ব কোনো ডিটেনশন সুবিধা নেই।
মাদক ব্যবহারকারীদের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, 'মাদকাসক্তদের যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার আওতায় আনতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।'
ইতোমধ্যে ঢাকার তেজগাঁওয়ে সরকারি কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পাশাপাশি তিনটি বিভাগীয় শহরে স্থাপিত পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
পাশাপাশি, ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটিকে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে উন্নীত করার কাজ চলছে।
মন্ত্রী জানান, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ১৪৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চালু করেছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি কেবল চিকিৎসা সেবাই দেবে না, বরং সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের মূল ধারার সমাজে ফিরিয়ে আনতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণও প্রদান করবে।
দেশে মাদকসেবীর সংখ্যার তুলনায় সরকারি চিকিৎসা সুবিধা এখনো অপ্রতুল স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, 'এই বাস্তবতার আলোকে সরকার বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করছে এবং চিকিৎসা সেবা উন্নত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।' বেসরকারি মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর সেবার মান বাড়াতে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি যোগ করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের অনুমোদিত ৪০৩টি বেসরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের মধ্যে ৭৩টিকে মোট ১.১০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে বিতরণ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক মাদক অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে ২৬ জুন রাজধানীতে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি পালন করা হবে। সকালে মৎস্য ভবন এলাকা থেকে একটি মাদকবিরোধী র্যালি শুরু হয়ে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হবে।
অপরাধের ধরন পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'মাদক এখন অনলাইনে বেচা-কেনা হচ্ছে। আর এর লভ্যাংশ অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে স্থানান্তর ও পাচার (মানি লন্ডারিং) করে সম্পদ গড়ে তোলা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, 'এসব অপরাধ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী আইনি কাঠামো অপরিহার্য।'
