ইরান যুদ্ধের জেরে সরবরাহ সংকট, এলএনজি ভর্তুকি প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৬,৬০০ কোটি টাকা
ইরান যুদ্ধের জেরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বাংলাদেশের ভর্তুকির বোঝা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকারকে চড়া মূল্যের স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হওয়ায় সেই ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রধান সরবরাহকারীরা 'ফোর্স মেজার' পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করে। ফলে পেট্রোবাংলার কাছে অস্থিতিশীল স্পট মার্কেটের বাইরে থেকে গ্যাস কেনার খুব একটা সুযোগ ছিল না। সেজন্য এই বাড়তি ভর্তুকির প্রয়োজন হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধের কারণে এলএনজি ভর্তুকি খাতে অতিরিক্ত ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল বরাদ্দের চেয়ে ১৭৬.৭ শতাংশ বেশি।
শনিবার পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, 'ইরান যুদ্ধের কারণে আমাদের অতিরিক্ত ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। মার্চ থেকে অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী ফোর্স মেজার জারি রেখেছে। ফলে আমরা স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছি।'
মোট প্রয়োজনীয় ভর্তুকির মধ্যে পেট্রোবাংলা ইতিমধ্যে সরকারের কাছ থেকে ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা পেয়েছে। বাকি সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আগামী মাসগুলোতে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ২ মার্চ ফোর্স মেজার ঘোষণা করে। এরপর ৫ মার্চ ওমানভিত্তিক ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড ও ৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সেলারেট এনার্জি একই পদক্ষেপ নেয়।
এই সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব কিছু স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ওপরেও পড়েছে, কারণ সেগুলোর লোডিং পোর্ট (পণ্য তোলার বন্দর) এবং নৌপথ কাতার ও হরমুজ প্রণালির সাথে যুক্ত ছিল।
যুদ্ধ শুরুর আগের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করার কথা ছিল। এর মধ্যে মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ৪১টি কার্গো আসার পরিকল্পনা ছিল, যার মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে কেনার কথা ছিল মাত্র ৮টি কার্গো।
তবে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পর পেট্রোবাংলা ওই সময়ে মোট আমদানির পরিমাণ কমিয়ে ৩৭ কার্গো নির্ধারণ করে। এর মধ্যে ২৫টি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়, যা পরিকল্পিত পরিমাণের চেয়ে তিনগুণেরও বেশি। প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম পড়েছে ২০ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত।
মিজানুর রহমান আরও জানান, ভর্তুকি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেট্রোবাংলা তাদের চলতি অর্থবছরের আমদানি পরিকল্পনা থেকে দুটি এলএনজি কার্গো বাদ দিয়েছে। 'বর্তমান বাজারদরে ওই দুটি কার্গো আমদানি করা হলে ভর্তুকির বিলে আরও ২ হাজার কোটি টাকার বেশি যোগ হতো,' বলেন তিনি।
ফোর্স মেজার অব্যাহত
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, সরবরাহকারীরা ফোর্স মেজার পরিস্থিতি জারি রাখায় আগামী ১৬ জুলাইয়ের আগে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ ফের শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
'দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীরা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেওয়া পর্যন্ত তারা সরবরাহ শুরু করতে পারবে না,' মিজানুর রহমান বলেন।
কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে স্বল্পমেয়াদি সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে, কারণ বেশিরভাগ কার্গোই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে।
এমন অনিশ্চয়তা চলতে থাকায় পেট্রোবাংলার এলএনজি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জুলাইয়ে সরবরাহের জন্য স্পট মার্কেট থেকে আরও দুটি কার্গো কিনতে দরপত্র আহ্বান করেছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস) রফিকুল ইসলাম বলেন, 'দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ কবে নাগাদ শুরু হতে পারে সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। আরপিজিসিএল এখন জুলাইয়ে জন্য এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করতে কাজ করছে।'
যুদ্ধপূর্ব বার্ষিক সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১ হাজার ১০ থেকে ১ হাজার ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের জন্য ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করার কথা ছিল। এই পরিকল্পনায় কাতারএনার্জি থেকে ৪টি, কাতার এনার্জি ট্রেডিং থেকে ২টি, ওকিউ ট্রেডিং থেকে ১টি, এক্সেলারেট এনার্জি থেকে ১টি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় ১টি ও স্পট মার্কেট থেকে ১টি কার্গো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিকল্পনা বিলম্বিত
ইরান সংকটের কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানি পরিকল্পনাও থমকে গেছে।
মিজানুর রহমান বলেন, 'ফোর্স মেজার প্রত্যাহার করা হলে আমরা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আমদানি পরিকল্পনা তৈরি করব। এর আগে এ ধরনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার মানে হয় না।'
তিনি আরও বলেন, পেট্রোবাংলা বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে পর্যাপ্ত কার্গো নিশ্চিতে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে।
