অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে হামে শিশুমৃত্যু ও চিকিৎসার ব্যয় বাড়ছে
সাড়ে পাঁচ বছর বয়সি আবদুল্লাহর সর্দি-কাশির উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর প্রায় দুই মাস ধরে ঢাকার দুটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। পরে তার হাম শনাক্ত হলে তাকে কয়েকবার শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) ভর্তি করা হয়।
তৃতীয় আরেকটি হাসপাতালে নেওয়ার পর কালচার করে দেখা যায়, তার শরীরে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। গত মাসে মারা যায় আবদুল্লাহ, তার চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকার বেশি।
চিকিৎসকরা বলছেন, আবদুল্লাহর ঘটনাটি ক্রমবর্ধমান সমস্যার প্রতিফলন, যার সম্মুখীন তারা সারা দেশের হামের ওয়ার্ড এবং আইসিইউগুলোতে হচ্ছেন।
হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অপুরসিত্র পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে চিকিৎসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অনেক শিশুকে বাঁচানো যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং গতকাল সকাল পর্যন্ত হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে ৬৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, গুরুতর অসুস্থ অনেক শিশুর শরীরেই এখন আর সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কাজ করছে না, ফলে তাদের চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিশুদের আইসিইউতে নেওয়া হলে শুরুতেই কালচার করে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে শিশুরা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক পাবে না, খরচ কমবে এবং জীবনও বাঁচানো যাবে।
ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাক যখন সময়ের সাথে সাথে নিজেদের পরিবর্তন করে ফেলে এবং আগে যেসব ওষুধ এদের বিরুদ্ধে কার্যকর ছিল, সেগুলোতে আর সাড়া দেয় না, তখন ওষুধ বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ঘটে।
এ বছর দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় রাজশাহী থেকে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুর খবর আসে প্রথম।
এরপর থেকে দেশের অন্য জেলা থেকেও হাম ও উপসর্গের মৃত্যুর খবর আসতে থাকে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল হামে শিশু মৃত্যুর জন্য অপুষ্টিই প্রধান কারণ। তবে পরে দেখা যায়, অধিকাংশ শিশুর শরীরে ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'প্রথমদিকে আমরা প্রায় ১৮টি শিশুকে পর্যবেক্ষণে নিয়ে দেখি, তাদের মধ্যে অন্তত ১২ জনই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছিল। কিন্তু পরে কালচার পরীক্ষায় দেখা যায়, অপুষ্টির চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স।'
চিকিৎসকরা বলছেন, হামে আক্রান্ত শিশুরা বিভিন্ন জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে বা আইসিইউতে ভর্তি হচ্ছে। হামের কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, এর সাথে দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার কারণে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু তাদের সহজেই আক্রান্ত করে।
চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কালচার টেস্ট
ডা. কামালের মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস এমন সংক্রমণ তৈরি করার সুযোগ পায়, যা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, তার আইসিইউতে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম। কারণ এখানে ভর্তির পরপরই কালচার টেস্ট করা হয় এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আগেই উচ্চমূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হলেও কাজ হয়নি। অথচ সঠিক কালচার করে দেখা গেছে, কম দামের ওষুধেই রোগী সেরে উঠছে।'
ডা. কামাল বলেন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এই রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। তাই সব হাসপাতালে আইসিইউতে রোগী ভর্তির পরপরই কালচার করে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসকরা আরও বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে রোগীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার—মানুষের পাশাপাশি কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতেও—রেজিস্ট্যান্স সমস্যাকে তীব্র করেছে।
ডা. কামাল বলেন, 'আগে ২০ টাকার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে যে রোগ সেরে যেত, তা সারাতে এখন ৫ হাজার টাকার অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রোধে 'ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ' নিতে হবে। শুধু মানুষ নয়, পোল্ট্রি, ফিশ গরুকেও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে না।
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি হামের রোগী চিকিৎসা নিয়েছে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে।
হাসপাতালটির মুখপাত্র ডা. আসিফ হায়দার টিবিএসকে জানান, বর্তমানে তাদের হাসপাতালে প্রায় ৩৫০ জন হামের রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে আইসিইউতে রয়েছে প্রায় ৪৫ জন।
তিনি বলেন, 'অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সর সমস্যা শুরু থেকেই হচ্ছিল। অনেক শিশুর শরীরে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না।'
ডা. আফিস হায়দার আরও বলেন, চিকিৎসকরা এখন এমন অনেক শিশু রোগী পাচ্ছেন, যারা হাম থেকে সেরে ওঠার পর সেকেন্ডারি ইনফেকশন নিয়ে আবার হাসপাতালে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের শরীরেও অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না।
তিনি বলেন, 'হামের চিকিৎসায় সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন না থাকলেও সেকেন্ডারি সংক্রমণ ঠেকাতে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। তবে অযথা ও অনুমাননির্ভর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।'
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম জানান, তারাও কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের রোগী পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'প্রেসক্রিপশন ছাড়া শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।'
