পরিবহন, কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
দেশের পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও জলবায়ু-সহনশীল খাতে রূপান্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের লিখিত উত্তরে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত না থাকলেও তার উত্তরগুলো সংসদের টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকার সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।'
তিনি জানান, জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ধাপে ধাপে এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে সড়কের ওপর চাপ কমাতে মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন করা হবে। এছাড়া অ্যাক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ ও স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার, সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং রাজধানী ঢাকার যানজট কমাতে রিং রোড ও রেডিয়াল সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রমও চলছে।
তিনি আরও জানান, মেঘনা ও যমুনা নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণ, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন বা প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে।
রেল খাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'যাত্রাসময় কমানো এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দেশের প্রধান রেলপথগুলোতে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে জাতীয় পরিবহন ব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং ধীরে ধীরে দেশের সব জেলা ও প্রধান শহরে রেলসেবা সম্প্রসারণ করা হবে।'
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যমতে, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় মোট ২৪টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে দেশের পুরো রেল নেটওয়ার্ককে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আউয়ালের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনঘনত্ব, বিস্তৃত নদীনির্ভর ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, খরা, অতিবৃষ্টি, বজ্রপাত, তাপপ্রবাহ ও লবণাক্ততার মতো দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে, যা মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, অবকাঠামো, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে জলবায়ু অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ততা কমানোর উদ্যোগ।
তিনি বলেন, '৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে পানি নিরাপত্তা, সেচ, নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিবেশগত ভারসাম্য উন্নত হবে। পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত ০.৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে।'
প্রধানমন্ত্রীর উত্তরে আরও বলা হয়েছে, 'ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী নদী, খাল ও জলাশয় খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং বৃক্ষমেলা আয়োজন অব্যাহত থাকবে।'
