প্রতিশোধ নয়, দেশ গড়ায় মনোযোগ দিতে হবে: তারেক রহমান
সকলকে প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, 'আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনায়ও কিছুটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা দরকার।'
তারেক রহমান বলেন, 'আমার কোমরের পেছনে একটা হাড় এখনও বাকা। সেটা আমাকে এখনো ভোগায়। প্রতিশোধ নিলেই কি সেই হাড় সোজা হয়ে যাবে? এসব বাদ দিয়ে দেশটা সুন্দর করে গড়ার দিকে মনোযোগ দিই।'
আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিগত সময়ে নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। আপনাদের সঙ্গেও হয়েছে। কিন্তু আপনি এখন প্রতিশোধ নিলেই কি আপনার সেই ক্ষতি ফেরত পাবেন বা সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে? হবে না। তাহলে আমরা সেই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ভাবি যে, আমরা দেশের জন্য, সমাজের জন্য বা মানুষের জন্য কী করতে পারি। সফল হওয়া বা না হওয়া পরের ব্যাপার। অন্তত এই (প্রতিশোধ) মানসিকতা নিয়ে আমরা সামনের দিনে এগিয়ে যাব না।"
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা একটি ভালো পরিবর্তন আনতে চাই। সেই পরিবর্তন আমি একা করতে পারব না, সরকারও একা পারবে না। আপনারা এ দেশের অংশ, সমাজের অংশ। আমাদের সবাইকে নিয়েই এটি সম্ভব। আমাদের ভুল হলে বলবেন। কিন্তু ভুলটাকে যদি পত্রিকার কাটতি বাড়ানো বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করেন, তাহলে সেটা উভয়ের জন্যই ক্ষতি বয়ে আনবে।'
বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন—এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, 'সরকার গঠনের আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আমরা দলীয় অবস্থান থেকে ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন আমরা সরকারে আছি। এখন এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দুটি ব্যবস্থা নিচ্ছি। এক, দলীয় অবস্থান থেকে ব্যবস্থা নিচ্ছি। দুই, আইন অনুযায়ী যা হওয়া উচিত, তা করার চেষ্টা করছি।'
ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো একটি জায়গা ঘিরে ফেলেছে এবং আমাদের কোনো সক্রিয় নেতা বা কর্মীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। সে সময়ে সাংবাদিকদের কারণে আমাদের অনেক নেতা বা সক্রিয় কর্মী গ্রেপ্তার হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। আপনারা সহযোগিতা করেছেন। আগে বা এত বছর আমাদের এভাবে সামনাসামনি বসার সুযোগ হয়নি। আজ এই অনুষ্ঠানে আপনাদের সঙ্গে বসার সুযোগ হয়েছে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের বিপদের সময় সহযোগিতা করার জন্য, তাদের ওপর হওয়া অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনি শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও তুলে ধরার জন্য এবং তাদের পাশাপাশি থেকে একই কষ্ট ভোগ করার জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে, দলের পক্ষ থেকে আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই।'
এ সময় দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে এখন একটি বড় সমস্যা হলো মাদক। বিশ্বব্যাপী কমবেশি থাকলেও আমাদের এখানে এর প্রকোপ আশঙ্কাজনক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কতজনকে ধরব, কতজনকে চিকিৎসা দেব বা কাউন্সেলিং করব? আমাদের তো সক্ষমতা ও সম্পদের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই এই সমস্যার সমাধানে আমাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।'
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের শারীরিক ও মানসিক যে বিপুল শক্তি থাকে, তা ইতিবাচক খাতে ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে হবে। আর এর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো খেলাধুলা ও সংস্কৃতি। অথচ ঢাকা শহরসহ সারা দেশেই এখন খেলার মাঠের তীব্র সংকট।'
তরুণদের এই শক্তিকে কাজে লাগাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমরা ইতোমধ্যে 'নতুন কুঁড়ি' স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করেছি। সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি শিক্ষা বিভাগীয় ইভেন্টে সারা দেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে অংশ নিয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে সব পরিবারের সন্তানরা এখানে যুক্ত হয়েছে। অথচ দুঃখের বিষয়, এত বড় একটি আয়োজন আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি।'
এ সময় কেবল খেলাধুলা নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তরুণদের মেধা বিকাশের জন্য জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী মেলা বা সায়েন্স ফেয়ার আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, 'বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিন (যেমন ১৬ ডিসেম্বর বা ২১ ফেব্রুয়ারি) ছাড়া কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সারা বছর সাংস্কৃতিক বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয় না? যুবসমাজকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে এই চর্চাগুলো সারা বছর চালু রাখতে হবে।'
তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার ওপর তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আজকাল দেখা যায়, একটি জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে এবং ১০ জন মিলে তা মোবাইলে রেকর্ড করছে। এগুলো অস্বাভাবিক মানসিকতা। স্কুল পর্যায় থেকেই আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।'
সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং সরকারের প্রস্তাবিত 'ফ্যামিলি কার্ড' ও 'ফার্মার্স কার্ড'-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
মতবিনিময় সভায় তথ্যমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
