নজরে কুয়ালালামপুরের দুই বিলাসবহুল হোটেল, বিভিন্ন দেশে এস আলমের সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত
বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে (এস আলম) ঘিরে আইনি ও আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত চলছে। তার এই সাম্রাজ্য চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পাচার করা অর্থ দিয়েই এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এস আলম।
চলতি বছরের মে মাসে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তার বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সাইপ্রাসে তার ও তার স্ত্রীর নামে থাকা একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়, বাংলাদেশে একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতেই তাকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। আর সিঙ্গাপুরে তদন্তকারীরা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। শুধু সিঙ্গাপুরেই তার সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বলে জানা গেছে।
এখন নজর কুয়ালালামপুরের দুটি বিলাসবহুল হোটেলের দিকে। হোটেল দুটি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এগুলো হলো কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং এর পাশের ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার।
হোটেল দুটির মালিক ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি (আগে নাম ছিল ক্যানালি লজিস্টিকস এসডিএন বিএইচডি)। এটি এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালে আইজিবি বিএইচডি (ওই সময় নাম ছিল আইজিবি কর্প বিএইচডি) মূল রেনেসাঁ হোটেলটি ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করেছিল।
কোম্পানি-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের শতভাগ মালিকানা রয়েছে ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডির হাতে। আবার এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আছেন ওং ওয়াই চিয়ং, পু সিন ইয়ি এবং আরিভালাগান চোকালিংগাম। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের মালিকানাধীন।
ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের প্রধান কাজ হলো আর্থিক ও বিমাবহির্ভূত খাতে সক্রিয় কোম্পানিগুলোর হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। এর শেয়ারহোল্ডার হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক চু কি সিয়ং। একইসঙ্গে তিনি হিলড্রিকস ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী, নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা।
হিলড্রিকস ক্যাপিটালের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাবার কম্পাউন্ড প্রস্তুতকারী ও পরিবেশক জিআইআইবি হোল্ডিংস বিএইচডি।
এর আগে হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড–১-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) পিটিই লিমিটেড জিআইআইবির ১৬.৫৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। তবে কিছু শেয়ার বিক্রির পর তারা আর উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকেনি।
জিআইআইবি দুর্নীতি তদন্ত, করপোরেট ভীতি প্রদর্শন, আইনি বিরোধ ও আর্থিক ক্ষতির মতো নানা কারণে আলোচনায় এসেছে।
অন্যদিকে, ২০২০ সালে বড় ধরনের সংস্কার কাজের জন্য ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল রেনেসাঁ হোটেলটি বন্ধ করে দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটি মালয়েশিয়ায় ম্যারিয়টের প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে পুনরায় চালু হয়। পশ্চিম অংশে রেনেসাঁ এবং পূর্ব অংশে নতুন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন পরিচালিত হচ্ছে। ম্যারিয়টের সরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো উভয় হোটেলের মালিক হিসেবে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের নাম উল্লেখ রয়েছে।
এ মুহূর্তে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বা সম্পত্তিগুলোর ওপর জব্দাদেশ জারি হয়েছে- এমন কোনো তথ্য নেই।
তবে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ ও জার্সি পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক তদন্তের কারণে, বাংলাদেশের সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলম-সংশ্লিষ্ট সম্পদগুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ ঘটনার সময়কাল কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর সফর
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথময় বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। জানা গেছে, প্রথম আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে, এরপর মালয়েশিয়া এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের কাছ থেকে।
গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার সফরটি নিশ্চিত হয়। সে হিসেবে আগামী ২১ ও ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফরের কথা রয়েছে। সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ারও কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২৪ মে বাংলাদেশের হাইকমিশন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। একই সপ্তাহে, ১৯ মে, সাইপ্রাসের আদালত এস আলমের সম্পত্তি জব্দ করেছিল। এরপর হাইকমিশনের সঙ্গে আলোচনার পর মালয়েশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেয়। ১ জুন আনোয়ার ইব্রাহিম আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করেন।
সফরে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।
তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এমন একটি দেশকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত দুটি ম্যারিয়ট-ব্র্যান্ডের হোটেল রয়েছে। কুয়ালালামপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থিত এই সম্পদগুলোর উপস্থিতি পর্যবেক্ষকদের নজর এড়াবে না।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করা। আধুনিক যুগের ঋণদাসত্বের অভিযোগ এবং কর্মীদের অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ততার মতো অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সাল থেকে এই শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে।
২০২৩ সালে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়, যখন অনেক শ্রমিক প্রায় ৬,৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করে মালয়েশিয়ায় এসে দেখতে পান, নিয়োগদাতাদের প্রতিশ্রুত চাকরিই বাস্তবে নেই। ২০২৪ সালের শুরুতে মালয়েশিয়া শ্রমিক প্রবেশ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশে এজেন্টদের অর্থ পরিশোধ করা প্রায় ১৮ হাজার কর্মী আর দেশটিতে যেতে পারেননি।
নতুন সরকারের অভিযানের মুখে এসব নিয়োগ এজেন্টের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় রাজনীতিবিদ ও এই নিয়োগ এজেন্টরা যোগসাজশের মাধ্যমে শ্রম রপ্তানি খাত থেকে বড় ধরনের সুবিধা নিতেন।
জনশক্তি খাতের এক কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগ পুনরায় চালু করা তারেক রহমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য। কারণ, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে তার ভাষ্য- বাংলাদেশ বর্তমান নিয়োগব্যবস্থা চালু রাখতে চায় না। তারা চায়, মালয়েশিয়া সরকার প্রভাবশালী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বেশি বাংলাদেশি কোম্পানিকে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ দিক।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে স্বীকৃত ১০২টি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ৪৩২টি নিয়োগ সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা দাতুক সেরি আমিনুল ইসলাম আবদুল নূর জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও বর্তমানে মালয়েশিয়ার নাগরিক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের নতুন সরকার আমিনুল এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। বিষয়টি এখনো দুই দেশের সরকারের পর্যায়ে আলোচনাধীন।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সম্পদ পুনরুদ্ধার ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থান পাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এমন এক সময়ে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যে রয়েছে, যখন মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদ নিয়ে নজরদারি এবং শ্রমবাজার পুনরায় চালুর চাপ উভয়ই বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কুয়ালালামপুরের এই হোটেল দুটিতে মোট ৯১৯ কক্ষ রয়েছে। এই হোটেল দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বিক্রির জন্য বাজারে উপস্থাপন করা হয়নি। তবে কয়েক বছর আগে মালিকপক্ষ এগুলোর সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ঠিক করেছিল। দুটি সম্পদের জন্য ১.২৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছিল তারা।
তবে সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট অনেক এজেন্টের মতে, এই মূল্য কিছুটা বেশি। এই সম্পদের প্রকৃত মূল্য ৮৫০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের মধ্যে হওয়াই বেশি যৌক্তিক।
বিশ্বজুড়ে তদন্ত বিস্তৃত হচ্ছে
১৯ মে সাইপ্রাসের নিকোসিয়ার আদালত সাইফুল আলম ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনের মালিকানাধীন সাইপ্রাসের পারেক্লিসিয়া এলাকায় অবস্থিত দুইতলা একটি আবাসিক সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেন। বাংলাদেশের অনুরোধে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির আওতায় সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা মোকাস আবেদন করার পর এই আদেশ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে বলেছেন, এই তদন্তে ৮ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি (প্রায় ৩৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত) অর্থ দেশ থেকে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাইফুল আলম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের বড় কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল, যার অনেকগুলোই পরে খেলাপি হয়ে যায়।
এসব অর্থ সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ ও জার্সিতে নিবন্ধিত বিভিন্ন কোম্পানি ও ট্রাস্টের মাধ্যমে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল কি না, তদন্তকারীরা সেটি খতিয়ে দেখছেন।
তদন্তের একটি অংশে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান অ্যাক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনালও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০১৬ সালে অ্যাক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড অধিগ্রহণের মাধ্যমে সাইফুল আলম প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা নেন।
একই বছর তিনি সাইপ্রাসের 'গোল্ডেন পাসপোর্ট' বা বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব কর্মসূচির আওতায় দেশটির নাগরিকত্বও পান। পরবর্তীতে সাইপ্রাস সরকার ওই কর্মসূচি বাতিল করে।
সাইপ্রাসের কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশি তদন্তকারীরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এস আলম ও তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করছেন। এস আলমের আন্তর্জাতিক আইনজীবী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে কুইন ইমানুয়েল আরকহার্ট অ্যান্ড সুলিভান। এই আইনজীবী দল সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তার সব বিনিয়োগ বৈধ বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে।
সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দের আদেশের পরদিনই বাংলাদেশে এস আলম আরেকটি ধাক্কা খান। ২১ মে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১–এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন তাকে এবং তার স্ত্রী, ছেলে ও ভাইসহ ১০ জন আত্মীয়-সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে নেওয়া ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় এ রায় দেওয়া হয়। ওই ঋণ এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের মাধ্যমে ১৩৪টি বাস কেনার জন্য নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে এস আলমকে দণ্ডিত করল।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এস আলম গ্রুপ বিপুল আর্থিক প্রভাব ও ক্ষমতা অর্জন করেছিল। সরকার পতনের পর থেকে এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়, তারা বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।
সিঙ্গাপুরে ১ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য তদন্তের আওতায়
২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর দেশটি এস আলমের বিদেশি সম্পদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশি তদন্তকারীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও বিনিয়োগ করে তিনি সিঙ্গাপুরে অন্তত ১ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৩.১৩ বিলিয়ন রিঙ্গিত) মূল্যের একটি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে হোটেল, আবাসিক সম্পত্তি, খুচরা বাণিজ্যিক সম্পত্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শেয়ার বিনিয়োগ।
আগের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এস আলমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকটি সম্পদ কেনার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩২৮ কক্ষবিশিষ্ট হোটেল গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর, যা ১৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারে কেনা হয়েছিল; লিটল ইন্ডিয়ার একটি খুচরা বাণিজ্যিক সম্পত্তি, যার মূল্য ছিল ১০ কোটি ৫ লাখ ডলারের বেশি; এবং ২০১৯ সালে ১২ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে অধিগৃহীত আইবিস নোভেনা হোটেল।
এদিকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ঢাকার একটি আদালত এস আলমের ৪০টি ব্যাংক হিসাব, তার স্ত্রীর ছয়টি হিসাব এবং সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত আটটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার জব্দের নির্দেশ দেয়।
এছাড়া তার দুই ছেলে আশরাফুল ও আহসানুল আলম, ভগ্নিপতি আহমেদ বেলাল এবং বোন মাইমুনা খানমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসাবও জব্দ করা হয়। দম্পতির যৌথ মালিকানাধীন দুটি সিঙ্গাপুরি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের বিনিয়োগও স্থগিত করা হয়।
সিঙ্গাপুরের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছে এস আলম গ্রুপের দেশীয় ও বিদেশি সম্পদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অভিযোগ করেছে, এস আলম বিদেশে প্রায় ১২.৮৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুরি ডলার পাচার করেছেন। এর মধ্যে ক্যানালি লজিস্টিকস নামে একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে, যা পরে মালয়েশিয়ায় িআবাসন খাতে সম্পদ কেনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
এস আলমের সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ওং পার্টনারশিপ দাবি করেছে, বাংলাদেশের মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তাদের মতে, সম্পদ জব্দের পদক্ষেপগুলো 'অবৈধ, স্বেচ্ছাচারী ও বৈষম্যমূলক'ভাবে নেওয়া হয়েছে এবং এতে বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ
চট্টগ্রামে আদালতের রায়, নিকোসিয়ায় সম্পত্তি জব্দ এবং সিঙ্গাপুরে বাড়তে থাকা চাপ- এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অর্থপাচার প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটি জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত কথিত অর্থপাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপসহ ১০টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মোট ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে প্রস্তুত করা একটি শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে সর্বোচ্চ ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৯৪২ বিলিয়ন রিঙ্গিত) পাচার হয়ে থাকতে পারে।
খবরে বলা হয়েছে, এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা দুই বার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন। গত বছরের নভেম্বরে হাইকোর্ট প্রথম আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া স্থগিত করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে আবেদন করা হলেও পরবর্তীতে আদালতের স্থগিতাদেশে সেটিও আটকে যায়। ফলে পরিবারটি এখন আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পরিবারটিকে নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমতি দিলে কথিত পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, দেশের ভেতরের সম্পদ জব্দ এবং আন্তর্জাতিক সালিশি কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
যে ব্যক্তি একসময় বাংলাদেশের অন্তত পাঁচটি ব্যাংক, একটি বিশাল শিল্পগোষ্ঠী এবং কুয়ালালামপুর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হোটেল সাম্রাজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন, তার জন্য পৃথিবী এখন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।
