মশা নিধনে ব্যয় শুধু বেড়েছেই, কিন্তু চট্টগ্রামে কমেনি মশার উপদ্রব
চট্টগ্রামে মশক নিধনে বছরের পর বছর ধরে খরচ কেবল বেড়েই চলেছে। এই ব্যয় এখন গিয়ে ঠেকেছে দৈনিক প্রায় ২ লাখ টাকায়। এরপরও ক্রমবর্ধমান মশার উপদ্রব থেকে তেমন রেহাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির অভাব, নিয়মিত ওষুধ না ছিটানো ও মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনে নিজস্ব কীটতত্ত্ব বিভাগ না থাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও সুফল মিলছে না।
মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুধু ওষুধ ও যন্ত্রপাতিতে ৫.৫০ কোটি ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এছাড়া ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে সংস্থাটির খরচ হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
এসবের পরও এ সময়ে ডেঙ্গুতে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত চার বছরে মশাবাহিত রোগে প্রতি বছর গড়ে ৫৫ জন মারা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২০০ মানুষ। এই পরিস্থিতি নগরীর মশক নিধন কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
চসিক মেয়রের প্রস্তাবিত বিদেশ সফর নিয়ে বিতর্ক, সিটি করপোরেশনের ক্রমবর্ধমান মশক নিধন বাজেট ও সাধারণ মানুষের অব্যাহত অভিযোগের মুখে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ব্যয় বেড়েছে, সুফল কম
চসিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান প্রশাসন তাদের প্রথম ১০ মাসে মশক নিধনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, তা সমসাময়িক সময়ের হিসেবে পূর্ববর্তী যেকোনো প্রশাসনের চেয়ে বেশি।
মেয়র শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৩.৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে চসিক। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম ১০ মাসে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
২০০০ সাল থেকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে চসিক মোট ৪৬.৯৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে গত এক দশকে এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের ওষুধ, নিয়মিত ওষুধ না ছিটানো ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনে নিজস্ব কীটতত্ত্ব বিভাগ না থাকায় এই বিপুল খরচের পরও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
উন্নতি দেখছেন না নগরবাসী
এই বিপুল খরচের পরেও চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, এখনো চরম মশার উপদ্রব রয়েছে।
হালিশহরের বাসিন্দা মহিমা আক্তার বলেন, 'সিটি করপোরেশন দাবি করে তারা মশা নিধন করছে। কিন্তু আমাদের এলাকায় তার কোনো প্রভাব দেখা যায় না। গত দুই মাসেও আমরা কাউকে দেখি নাই মশার ওষুধ ছিটাতে।'
চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, 'পরিবারে স্কুল-কলেজপড়ুয়া সন্তান আছে। সন্ধ্যার পর তাদের পড়াশোনায় সমস্যা হয়। অনেক সময় মশার কামড়ে অসুস্থও হয়ে পড়ে।'
মেয়রের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে বিতর্ক
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যেই সম্প্রতি চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের মশা নিধনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও জৈবিক লার্ভিসাইড উৎপাদন ব্যবস্থা পরিদর্শনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তাব বাতিল করে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, মশক নিধন শেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, বরং দেশের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেই কার্যকর সমাধান বের করা সম্ভব।
তবে মেয়র তার এই সফরের পক্ষে যুক্তি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে জৈবিক লার্ভিসাইড উৎপাদন কারখানা স্থাপনের একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে বিদেশ থেকে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো এবং মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলতে পারত।
অনিয়মিত স্প্রে ও জনবল সংকট
চসিকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪১টি ওয়ার্ডের জন্য মোট ৩৫৫ জন কর্মী কাজ করছেন। মশার বংশবিস্তার রোধে প্রতিটি ব্লকে প্রতি ৭২ ঘণ্টা পরপর পুনরায় স্প্রে করা হয়।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বলেন, ৭২ ঘন্টা নয়, দুই মাসেও একবার দেখা যায় না ওষুধ ছিটানোর কাউকে। মাঝে মাঝে দীর্ঘ বিরতিতে দেখা গেলেও দায়সারাভাবে ফগার মেশিন দিয়ে কিছু ওষুধ দিয়ে চলে যায়।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নগরীর ৭০ লাখ মানুষকে মাত্র সাড়ে তিনশো কর্মী দিয়ে সেবাপ্রদান করা কঠিন। তিনি স্বীকার করেন, অনেক কর্মী যথাযথ দায়িত্ব না নিয়ে লোকদেখানো একটু স্প্রে মেরে চলে আসে। তবে কোনো এলাকা যেন বাদ না পড়ে, তাই অন্তত সপ্তাহে একবার ওষুধ ছিটানো নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন কাজ করছে। এজন্য এলাকাভিত্তিক সমিতি ও সংগঠনের নেতাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ওপর নজরদারি রাখতে এবং গাফিলতি দেখলে অবহিত করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা মারার চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। তাই চসিক এখন ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটানোর চেয়ে মশার লার্ভা ধ্বংসে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে।'
বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা মো. সরফুর ইসলাম মাহি বলেন, ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করার জন্য চসিক আইসিডিডিআর,বি-সহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে মশক নিধন কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও তথ্যনির্ভর করতে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় ল্যাব থাকা দরকার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম টিবিএসকে বলেন, চসিকের মশা নিধন কার্যক্রমে বড় ধরনের একটি কাঠামোগত ঘাটতি হলো কীটতত্ত্ববিদের সম্পৃক্ত না করা। এই বিশেষজ্ঞ পরামর্শের অভাব এবং বাস্তবায়নকারীদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মশা নিধন কার্যক্রমে বড় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ছাড়া বড় বাজেট দিয়েও কার্যকর ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, গত কয়েক দশকে মশার মধ্যে প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে আগে যে ওষুধে মশা মরত, এখনকার মশা সে ওষুধে আর মরছে না। সিটি করপোরেশন মূলত তাদের প্রথাগত পদ্ধতিতেই মশা নিধনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মশা নিয়ে তাদের কাছে কোনো হালনাগাদ গবেষণা নেই। মশার লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশার ওপর কোন কীটনাশক কার্যকর হবে, তা ল্যাবরেটরিতে নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
