আদ-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: কারণ এখনও অজানা, ময়নাতদন্ত না হওয়ায় জটিলতা
চার দিন পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও চূড়ান্ত কোনো কারণ জানা যায়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে এ ঘটনায় ময়নাতদন্ত (অটোপসি) না হওয়াকে প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, শুধু এসি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা সাধারণ কোনো কারণে একসঙ্গে এত নবজাতকের মৃত্যু হওয়া 'বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন'। ময়নাতদন্ত না হওয়ায় তদন্তকে এখন অনেকাংশে পরোক্ষ তথ্য, পরিবেশ বিশ্লেষণ এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে দুর্বল করে দিতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হান রোববার সন্ধ্যায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা যে তদন্ত কমিটি করেছি, তারা কাজ করছে। এখন পর্যন্ত আমরা তাদের কাছ থেকে কোনো আংশিক তথ্যও পাইনি। তারা ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আরও দুই দিন সময় চেয়েছে।"
তিনি বলেন, "চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই আমরা বিস্তারিত জানাতে পারব। এখন কিছু বললে তা অনুমাননির্ভর হয়ে যেতে পারে এবং তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে।"
প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থলকে একটি 'বন্ধ জায়গা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, "সিম্পলি গ্যাস বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণে মৃত্যু হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে আসতে হলে আমাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার।"
গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। পুলিশ সে সময় জানিয়েছিল, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। ঘটনার তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি কমিটি গঠন করেছে। এক দফা সময় বাড়িয়ে আগামী ৩ জুন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, "ছয়টি শিশুই শতভাগ সুস্থ ছিল—এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। একটি কারণ অবশ্যই থাকতে হবে।"
তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে ময়নাতদন্ত না হওয়া। তিনি বলেন, "ময়নাতদন্ত হলে বিষয়টি অনেক সহজ হতো। কিন্তু অভিভাবকরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তারা কোনো মামলা বা ময়নাতদন্ত চান না। ফলে তদন্ত কিছুটা জটিল হয়ে গেছে।"
তিনি আরও বলেন, "তদন্তটি এখন রাষ্ট্রের স্বার্থে হচ্ছে, ভুক্তভোগীদের স্বার্থে নয়। যদি ভুক্তভোগীদের স্বার্থে হতো, তাহলে ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হতো এবং বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে জানা যেত।"
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্চয় দে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এ ধরনের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ময়নাতদন্তকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, "যখন কোনো সূত্র পাওয়া যায় না, তখন ময়নাতদন্ত করে কারণ বের করা হয়—এটাই আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত পদ্ধতি।"
তার মতে, "একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। সংক্রমণ, জন্মগত জটিলতা বা অন্য কোনো কারণ থাকলেও মৃত্যুতে সাধারণত কিছু সময় লাগে। কিন্তু এখানে দ্রুত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।"
ডা. সঞ্চয় দে বলেন, "ময়নাতদন্ত না হলে প্রকৃত কারণ জানা খুবই কঠিন। তখন সবাই অনুমানভিত্তিক কথা বলবে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না।"
তিনি আরও বলেন, "এসি বন্ধ করলেই মৃত্যু হবে—এটা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। অন্য কোনো গ্যাস, ভেন্টিলেশন সমস্যা বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্তেই বের করতে হবে।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সাধারণত কোনো স্থানের নমুনা পরীক্ষা করে দেখে সেখানে বাতাসের স্বাভাবিক উপাদানগুলো ঠিক আছে কি না এবং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কোনো গ্যাস বা উপাদান রয়েছে কি না।
তিনি বলেন, "প্রাথমিকভাবে তারা ওই হাসপাতালে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো গ্যাস বা উপাদান পায়নি।"
ঘটনাস্থলে ঝাঁঝালো গন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা যখন সেখানে গিয়েছিলেন, তখনও এই গন্ধ ছিল। কিন্তু গন্ধটির উৎস বা কারণ কী, তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না।"
আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ২৬ মে রাত ২টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড-২–এর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রগুলো চালু থাকলেও কয়েকজন নবজাতকের মা সেগুলো বন্ধ করার অনুরোধ জানান। একপর্যায়ে কর্তব্যরত নার্সরা এসিগুলো বন্ধ করে দেন।
রাত ৩টার দিকে আবার এসি চালু করা হয়। এরপর রাত ৪টার দিকে একটি নবজাতক অস্বাভাবিকভাবে কান্না শুরু করলে তাকে দ্রুত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)–তে নেওয়া হয়। পরে পর্যায়ক্রমে আরও পাঁচ নবজাতককে দ্রুত এনআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
সকাল ৬টার দিকে প্রথম নবজাতকের মৃত্যু হয়। এরপর সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে আরও পাঁচ নবজাতকের মৃত্যু ঘটে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ওই ওয়ার্ডে সদ্য সন্তান প্রসব করা মায়েরা নবজাতকসহ অবস্থান করছিলেন এবং রাতে তিনজন নার্স দায়িত্বে ছিলেন।
তবে মারা যাওয়া দুই যমজ নবজাতকের মা নাজমা বেগম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, নবজাতকেরা অসুস্থ হয়ে পড়লেও সেখানে কোনো নার্স বা আয়া উপস্থিত ছিলেন না। তার দাবি, সকাল ৬টার দিকে অভিভাবকেরাই নিজেদের উদ্যোগে শিশুদের এনআইসিইউতে নিয়ে যান। এছাড়া তারা কক্ষের ভেতরে একটি ঝাঁঝালো গন্ধও অনুভব করেছিলেন।
আদ-দ্বীন হাসপাতালকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা
এদিকে টেম্পারেচার মনিটরিং সিস্টেম না থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে আদ-দ্বীন হাসপাতালকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রোববার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যৌথ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এ জরিমানা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
বিচার চান আদ-দ্বীনে মারা যাওয়া যমজ নবজাতকের মা
আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে মারা যাওয়া ছয় নবজাতকের মধ্যে রাজধানীর সবুজবাগের বাসিন্দা নাজমা বেগমের যমজ দুই ছেলেও ছিল। সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত এখনও তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো।
রোববার বিকেলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "রাত দুইটার দিকে হঠাৎ দেখি একটা ছেলে বমি করছে। আমি নিজেই পরিষ্কার করলাম। এরপর আরেকটা বমি করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি পাশের বাচ্চাগুলোও কাঁদতে শুরু করেছে।"
তিনি বলেন, ধীরে ধীরে পুরো ওয়ার্ডজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
"একজন আরেকজনকে সামলাতে পারছিল না। সবাই বাচ্চা কোলে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছিল। কেউ বাচ্চাকে ঠিকমতো দুধও খাওয়াতে পারছিল না," বলেন তিনি।
নাজমার ভাষ্য, "মোরগ জবাই করলে যেভাবে ছটফট করে, বাচ্চাগুলো সেভাবে ছটফট করছিল।"
তার মতে, রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়েও কোনো নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
"আমরা কাউকে পাইনি। নার্স ছিল না। কোথায় যাব, কাকে ডাকব—এই অবস্থায় কেউ বাচ্চা রেখে বাইরে যেতেও পারিনি। এ হাসপাতালে যেহেতু পুরুষ স্বজন থাকতে পারে না, তাই আমরা বুঝতে পারছিলাম না কী করব," বলেন নাজমা।
তিনি আরও বলেন, "এসি বন্ধ ছিল। গরম লাগছিল, অস্থির লাগছিল। একটা ঝাঁঝালো গন্ধও পেয়েছি। বাইরে থেকে ঘরে ঢুকলেই গন্ধটা বেশি লাগত।"
তার দাবি, এই গন্ধ নতুন ছিল না। রুমে ঢোকার সময়ও ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যেত, তবে সেদিন এসি বন্ধ থাকায় গন্ধটি আরও বেশি অনুভূত হচ্ছিল।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তার সন্তানরা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।
"কোনো রোগ ছিল না। ওজনও ভালো ছিল, জন্ডিসও ছিল না। যে ডাক্তার সিজার করেছেন, তিনি দুই দিন বাচ্চাগুলোকে দেখেছেন, তাদের ছবি তুলেছেন," বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
রোববার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি নাজমা বেগমের সঙ্গে কথা বলেছে। এখন তার একটাই দাবি, "যদি কোনো গাফিলতি থাকে, তাহলে যারা দোষী তাদের শাস্তি হোক। আর কোনো মা যেন আমার মতো কষ্ট না পায়।"
