আ.লীগের লোকেরা বলেছিল, ‘গুলিতে মরেনি, ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন’: ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ এক ভুক্তভোগী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এক রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন চিকিৎসকদের শাসিয়ে বলেছিল— 'গুলি করা হয়েছে মরেনি, ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন'।
মঙ্গলবার (১৯ মে) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি দেন এই ভুক্তভোগী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ষষ্ঠতম সাক্ষী। নিরাপত্তার স্বার্থে আদালত ও প্রসিকিউশন তাঁর নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি। ভুক্তভোগী এই ব্যক্তি রামপুরার মেরাদিয়ায় একটি বাড়িতে দারোয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, "আমি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে রামপুরা থানার পাশে মেরাদিয়া কাঁচাবাজারে ছাত্র-আন্দোলন দেখতে যাই। বাজারে যেতেই বিজিবি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন মিলে ছাত্রদের ওপর গুলি করতে দেখি। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে কিছু লোক মারা যান এবং আহত হন আরও অনেকে। সবাই রক্তাক্ত ছিলেন। এসব দেখে ভয়ে বাসার দিকে রওনা দিই। তখন পেছন থেকে আমার কোমরের নিচে একটি গুলি লেগে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়।" এ সময় তিনি ট্রাইব্যুনাল কক্ষে নিজের পরিহিত প্যান্ট খুলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ক্ষতস্থানটি বিচারকদের দেখান।
ভুক্তভোগী আরও বলেন, "গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে কিছু লোক আমাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ওই দিন চিকিৎসা হলেও ২০ জুলাই রাতে আমাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কারণ ওই দিন হাসপাতালের চিকিৎসকদের হুমকি দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের লোকজন। তারা বলেছিলেন— 'এদের গুলি করা হয়েছে মরেনি, এদের ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন'। এরপর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও আমাকে দেওয়া হয়নি।"
সাক্ষী জানান, হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে আসার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাঁর বাসায় হানা দেন। তাঁকে বলা হয়, "তুমি গুলি খেয়েছো, এই এলাকায় থাকতে পারবে না।" তবে এলাকার এক নির্দলীয় ব্যক্তির আশ্রয়ে তিনি রক্ষা পান এবং পরবর্তী সময়ে নিজের জমানো টাকা খরচ করে ফরাজি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
নিজে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার জন্য সাক্ষী বিজিবির তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম, মেজর মো. রাফাত বিন আলম, পুলিশের এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানকে দায়ী করেন। সাক্ষী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি এখন কোনো কাজ করতে পারেন না। তিনি এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
এই মামলায় মোট আসামি চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন রামপুরায় গুলি চালিয়ে আলোচনায় আসা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলম। মামলার অন্য দুই আসামি— ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম ও মার্জিনা রায়হানসহ অন্যান্যরা। আদালত সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য দিন ধার্য করেন।
