রাজশাহীতে সরকারি কলেজে হামলা: অধ্যক্ষসহ আহত ৫; অভিযুক্ত বিএনপি নেতা বহিষ্কার
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা চলাকালীন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের চালানো এই হামলায় কলেজের অধ্যক্ষসহ অন্তত ৫ জন শিক্ষক ও কর্মচারী আহত হয়েছেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত স্থানীয় বিএনপি নেতা আকবর আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে কলেজ চলাকালীন এই নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় কলেজে ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষাকেন্দ্র বিবেচনায় প্রশাসন থেকে কলেজ ও এর আশেপাশের ১০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল এবং নিরাপত্তার জন্য সকাল থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিল।
পুলিশ, শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কলেজে প্রবেশ করে অধ্যক্ষের কক্ষে যান। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষকদের সাথে তাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে তারা শিক্ষকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং কলেজের অফিস কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর করে।
হামলায় আহতরা হলেন—কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলম এবং কলেজের আরও দুই কর্মচারী। আহতদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও আলেয়া খাতুন হীরার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলার সময় কলেজে অবস্থানরত পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই প্রাণভয়ে পালিয়ে যান।
আহত শিক্ষকদের অভিযোগ, জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীর নেতৃত্বে জয়নগর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আফাজ আলী, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও মৎস্য ব্যবসায়ী শাহাদ আলী, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আলী, ৪নং ওয়ার্ড দাওকান্দি বিএনপির সভাপতি এজদার আলী, জয়নগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি রুস্তম আলী ও ছাত্রদল নেতা জামিনুর ইসলাম জয়সহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী এই হামলায় সরাসরি অংশ নেন।
অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, "সরকারি আদেশে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আমার কাছে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে আসছিল বিএনপির নেতাকর্মীরা। আমি তাদের ঠিকমতো চিনিও না।"
প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা অভিযোগ করেন, "বিএনপির কয়েকটা গ্রুপ প্রায়ই কলেজে এসে হিসাব-নিকাশ চাইত, যা আসলে ছিল চাঁদার দাবি। অধ্যক্ষ মহোদয় নতুন আসায় কোনো পক্ষকেই গ্রহণ করেননি, এটাই তার অপরাধ ছিল। আর আমি একজন সহকর্মী হিসেবে তার পাশে থাকায় আমার ওপরও হামলা করা হয়েছে।"
অভিযোগ প্রসঙ্গে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা দাবি করেন, "সাবেক অধ্যক্ষ ও আওয়ামী লীগ নেতা মোজাম্মেল হকের আমলের দুর্নীতি ও অনিয়মের হিসাব চাইলে কর্তৃপক্ষ তা দিতে অস্বীকার করে ভয়ভীতি দেখান। ঘটনার দিন শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরাই প্রথমে আমাদের নেতাকর্মীদের চড়-থাপ্পড় মারেন, যার ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে এই ঘটনা ঘটেছে।"
অন্যদিকে, দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম জানান, "১৪৪ ধারা জারির মধ্যে আমরা বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেও কিছু লোক কলেজে অনধিকার প্রবেশ করে হামলা চালায়। বর্তমান সময়ে পুলিশ সদস্যরা কতটা অসহায় ও নিরুপায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।"
এদিকে, দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ঢুকে ভাঙচুর ও শিক্ষিকার সাথে অশোভন আচরণের অভিযোগে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকার সুষ্পষ্ট অভিযোগে আকবর আলীকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
