জ্বালানি নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে আজ থেকে সরবরাহ বাড়াচ্ছে সরকার
জ্বালানির দাম বাড়ানোর একদিন পর সরকার আজ থেকে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ ১০-২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যাতে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল নিতে এসে দীর্ঘসময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরচালকদের ভোগান্তি কিছুটা কমে।
গতরাতে জারি করা এক বার্তায় জ্বালানি বিভাগ জানায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর অধীন বিতরণকারী কোম্পানিগুলো ২০ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন ১৩,০৪৮ টন ডিজেল, ১,৪২২ টন অকটেন এবং ১,৫১১ টন পেট্রল বিক্রি করবে। এতে ডিজেল ও পেট্রলের সরবরাহ ১০ শতাংশ এবং অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়াতে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, বর্তমান জ্বালানি তেলের চাহিদা বিবেচনায়, ডিলার ও ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে বর্ধিত হারে বিপিসির অধীনস্থ কোম্পানিগুলো কর্তৃক জ্বালানি তেল বিক্রয় করার বিষয়ে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
এর আগে সরকার অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা, পেট্রলের দাম ১৯ টাকা এবং ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়েছে, যা গতকাল থেকে কার্যকর হয়েছে।
গতকাল জাতীয় সংসদে পাম্পগুলোতে তেলের সংকটের জন্য জন্য প্যানিক বায়িং, অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুদ ও কালোবাজারিকে দায়ী করেছেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
তিনি বলেছেন, "দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। তবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।"
এদিকে ভর্তুকির চাপ কমাতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি দাম ১৫-২০ টাকা বাড়ালেও, তেল পেতে জনগণের ভোগান্তি দূর হয়নি। গতকালও সারাদেশে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও জ্বালানির ঘাটতি অব্যাহত ছিল, এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
অনেক মোটরচালক আশা করেছিলেন, দাম বাড়ানোর পর ডিপো থেকে পাম্পে সরবরাহ বাড়বে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংকট কিছুটা কমবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি।
রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের এখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে দেখা গেছে।
কিছু ফিলিং স্টেশনে শনিবার মধ্যরাতে লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেল আরোহীরা গতকাল বিকেলে গিয়ে জ্বালানি পেয়েছেন। তবুও অনেকেই অভিযোগ করেছেন, তাদের ট্যাংকভর্তি করে তেল নিতে দেওয়া হয়নি।
অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার ও কালোবাজারি প্রতিরোধে পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং টিম গঠন ও ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাসহ জ্বালানি বিভাগের নেওয়া উদ্যোগগুলোও কোন কাজে আসছে না। এসব পদক্ষেপও এপর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটাতে পারেনি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানী মন্ত্রণালয় এমন এক 'ন্যারেটিভ' (বয়ান) তৈরি করেছে যে, দেশে 'তেলের মজুদ উপচে পড়ছে এবং তেল রাখার জায়গা নেই'।
''অথচ দেশের মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছে না। সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে জ্বালানি বিভাগ, বিপিসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাই কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটা বর্ণনা করার কোনো ভাষা নেই''- টিবিএসকে বলেন তিনি।
শামসুল হক বলেন, জ্বালানি বিভাগ যদি বলতো যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ডলার সংকট, হরমুজ প্রণালি সংকটের কারণে তেল সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না, তাহলেও এই ভোগান্তি মেনে নেওয়া যেতো। "কিন্তু জ্বালানি বিভাগ উল্টো নারেটিভ তৈরি করেছে। তারা স্বীকারই করছে না যে, তেলের কোনো সংকট রয়েছে। সেক্ষেত্রে বলতে হয়, সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা সরকারের ভয়ংকর অদক্ষতা ও অক্ষমতার প্রমাণ।"
দাম বাড়ানোর পর তেলের সরবরাহ বাড়ানো হবে কি-না এমন প্রশ্নে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, "আমরা প্রায়শই নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় বেশি তেল সরবরাহ করছি। কিন্তু প্যানিক বায়িং বন্ধ না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।"
পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি সাজ্জাদুল করিম কাবুল টিবিএসকে বলেন, দাম বাড়ানোর পর ডিপো তেলের সরবরাহ বাড়েনি। ''তেলের দাম বাড়িয়ে কি হবে? সরবরাহ বৃদ্ধি না করলে তো এই সংকট তো যাবে না। এক সপ্তাহ যদি তারা পুরাদমে সরবরাহ করতো, তাহলে সব ঠাণ্ডা হয়ে যেতো।''
তিনি বলেন, ''ওই হরমুজ প্রণালি না কি আবার বন্ধ হয়ে গেছে—সেজন্য ওনারা ভয় পাচ্ছেন। তেল দিয়ে ফেললে যদি তেল আর না থাকে।''
কাবুল বলেন, ''তেল সরকারেরে কাছে আছে কি-না তাও তো আমরা বুঝি না। ওনারা যেভাবে প্রেসে বলতেছেন যে ৫০ বছরের মধ্যে হায়েস্ট (সর্বোচ্চ) মজুদ আছে। তো মজুদ থাকলে তেল দাও।''
তিনি বলেন, আজকে আমার ১৩,৫০০ লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংক লরিতে ডিপো থেকে ৯,০০০ লিটার তেল দিয়েছে। গত তিনদিন ধরে এইভাবেই দিচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদেও সরকারের অবস্থানের সমালোচনা হয়েছে। এতে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, "সরকার জনগণের সঙ্গে মিথ্যাচার করছে।"
গতকাল রোববার পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ''সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, অথচ বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তায় তেলের জন্য ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভাররা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছে না। সরকারের যদি কোনো সংকটই না থাকে, তবে এই লম্বা লাইন কেন? কেন তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে?"
গবেষণা সংস্থা–সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দাম বাড়ায় সরকার আর ভর্তুকির চাপ বহন করতে পারছিল না, তাই দাম বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, "এখন ভোক্তারা চান যেন সহজে জ্বালানি পাওয়া যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারকে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।"
@দেশজুড়ে স্থবিরতা
টিবিএস প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, সংকট শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়। সাভার থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, রোববার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৭৫ শতাংশ ফিলিং স্টেশনে অকটেন ও পেট্রল ছিল না। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৬৮ শতাংশ পাম্পে ডিজেল থাকলেও—অল্প কয়েকটি সচল স্টেশনে অতিরিক্ত চাপের কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বগুড়ায় পণ্যবাহী ট্রাকগুলো পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় পরিবহন খাতে প্রভাব পড়েছে। বরিশাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সরবরাহ কবে শুরু হবে সে বিষয়ে ডিপো থেকে কোনো স্পষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।
সাভারের এসআই চৌধুরী ফিলিং স্টেশনসহ কিছু পাম্পের ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, তারা সাপ্তাহিক স্বাভাবিক বরাদ্দের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অকটেন পেয়েছেন।
@টিবিএসের স্থানীয় প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন
