দেশে হামে মৃত্যু ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, আক্রান্ত ৬৬ শতাংশ শিশুই টিকা পায়নি
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে এ বছর রেকর্ড সংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এবং আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশই টিকার একটি ডোজও পায়নি।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, সন্দেহভাজন হিসেবে তালিকাভুক্ত শিশুদের মধ্যে ৪৭ শতাংশেরও বেশি কোনো ধরনের টিকা গ্রহণ করেনি। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ২০৬ জন শিশু মারা গেছে, যাদের মধ্যে ৩৪ জন ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হামের কারণে এবং ১৭২ জন সন্দেহভাজন হিসেবে মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৩,০৬৫ জন ল্যাবে নিশ্চিত হওয়া রোগী এবং ২০,৩৫২ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময় সুস্থ হয়েছেন ১০,৪৯৬ জন।
এর আগে ২০১৭ সালে ১০ জনের মৃত্যু ছিল গত এক দশকে হামে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড।
এই প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ফল। করোনা মহামারির প্রভাব, সরকারি কার্যক্রম পরিকল্পনা স্থগিত হওয়া, টিকা ক্রয়ে বিলম্ব এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বারবার কর্মবিরতির কারণে রুটিন টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
২০২০ সালের পর থেকে বড় পরিসরে কোনো হাম টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং বৈদেশিক সহায়তা অনুমোদনে দেরির কারণে ক্রমেই টিকার বাইরে থেকে যায় বিপুলসংখ্যক শিশু। ফলে 'হার্ড ইমিউনিটি' ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে এবং প্রাদুর্ভাবের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, অপর্যাপ্ত টিকাদানই এই ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। তিনি টিবিএসকে বলেন, 'হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হওয়ায় হাম সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে।'
ইপিআই-এর তথ্যমতে, নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীদের ৮৫ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। এসব শিশুদের মধ্যে ৬৫.৭ শতাংশের কোনো টিকাই ছিল না এবং ২১ শতাংশ শিশু কেবল আংশিক টিকা পেয়েছিল। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১% নিশ্চিত এবং ২৫.৫% সন্দেহভাজন রোগী এক ডোজ এবং যথাক্রমে ১৩.৩% ও ২৭.২% দুই ডোজ টিকা পেয়েছিল।
ডা. বেনজির আহমেদ জানান, হার্ড ইমিউনিটি গড়তে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ প্রয়োজন। ১৯৮৯ সালে টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর থেকে বড় কোনো প্রাদুর্ভাব দেখা না গেলেও, বর্তমানে কোভিড-১৯ এবং পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম পরিকল্পনা স্থগিত হওয়ার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
তিনি জানান, করোনা মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। ইপিআই বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কার্যক্রম পরিকল্পনা স্থগিত হওয়ায় টিকাদান কর্মসূচিতে যে কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়, তারই ফলে টিকার হার কমে গেছে।
ইপিআই কর্মকর্তাদের মতে, বিকল্প পরিকল্পনার অনুমোদনে দেরি, টিকা ক্রয় ও বিতরণে অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং টিকার তীব্র সংকট নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে। তারা আরও জানান, ২০২৫ সালে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের তিন দফার কর্মবিরতি অনেক শিশুকে টিকা থেকে বঞ্চিত করেছে।
ইপিআই আরও উল্লেখ করেছে যে, ২০২০ সাল থেকে কোনো বড় ধরনের প্রচার অভিযান না চালানোয় হামের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশ ২০২৩ সালে 'গ্যাভি'র (টিকাদান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক জোট) কাছে সহায়তার আবেদন করেছিল, কিন্তু ২০২৫ সালের আগে তা অনুমোদিত হয়নি, যা প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটিয়েছে।
কার্যক্রম পরিকল্পনা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে 'হঠকারী' বলে বর্ণনা করে ডা. বেনজির সতর্ক করেছেন যে, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বন্ধ করা দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি আরও বলেন, টিকাদান কর্মসূচি দুর্বল হওয়ার প্রভাব কেবল হাম নিয়ন্ত্রণের ওপরই নয়, বরং ডিপথেরিয়ার, হুপিং কাশি, জলাতঙ্ক, কালাজ্বর ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলার ওপরও পড়ছে।
গতকাল ঢাকায় জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে ইউনিসেফের সহায়তায় আয়োজিত এক কর্মশালায় ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক (টিকাদান) ডা. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, হামের টিকার এক ডোজ ৮৫ শতাংশ এবং দুই ডোজ প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্যকর। ২০২৩ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজের হার ৮৬.১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮০.৭ শতাংশ। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু কোনো সুরক্ষা ছাড়াই রয়ে গেছে।
ডা. রিয়াদ বলেন, ৪-৫ বছর ধরে টিকার বাইরে থাকা শিশু জমতে থাকলে প্রাদুর্ভাবের সম্ভাবনা বাড়ে। সুরক্ষাহীন শিশুর সংখ্যা কমাতে এবং 'হার্ড ইমিউনিটি' শক্তিশালী করতে প্রতি চার বছর পর পর হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন।
বর্তমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার ৫ এপ্রিল থেকে ৩০টি উপজেলা ও ১৩টি পৌরসভায় প্রায় ১২ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে একটি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যেখানে ৯,৭৬,৮৩৮ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
ডা. রিয়াদ জানান, বর্তমানে সব সিটি কর্পোরেশন এলাকায় টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। ২০ এপ্রিল (সোমবার) থেকে দেশব্যাপী শুরু হতে যাওয়া বৃহৎ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৬ জন শিশু।
প্রাথমিক পর্যায়ে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলা, ১৩টি পৌরসভা এবং ৪টি সিটি কর্পোরেশনের ২১,৮০,১০৫ জন শিশুকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চলবে। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১১,৩১,১২৮ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫২ শতাংশ।
ডা. রিয়াদ জানান, এবারই প্রথম ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের এই অভিযানে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুই টিকার যোগ্য, তবে বর্তমানে যারা অসুস্থ তাদের সুস্থ হওয়ার পর টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
